অভিজ্ঞ বই


                        ✍️কৃষ্ণ ধন শীল 
                 

পুরনো,নানা জ্ঞানে পূর্ণ  বই গুলির মধ্যে অনেক গুলি এখন আর দেখতে পাইনা,
হয়তো তারা অনেকেই শতাব্দী প্রাচীন!
আর অবশিষ্ট কিছু আছে যাদের ভাষা 
এখন প্রায় বোধগম্য নয় বার্ধক্যের কারণে,
কিন্তু তাদের শৈশব-যৌবন ছিল খুব রঙীন।

আজ গ্রামের পথের মোড়ে কিংবা হাঁটে 
কোনো কীর্তন আসরে বা বাড়ির ঘাটে,
বড়োই করুণ বেশে দেখা হয় আমাদের!
কতকিছু আমার অজানা রয়ে গেছে হায় 
সময় আর ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী তারা, 
সুন্দরী-বলবান যত শয্যায় জৌলুস হারা। 

অভিজ্ঞতার সাহিত্যে তারা সত্যিই রত্নাকর
আমার গ্রামের বিজ্ঞ চেহারার বই গুলি 
একে একে হারিয়ে যাচ্ছে কালের প্রকোপে!
কত কথা গল্প ছড়া আর কত জীবন গাঁথা 
কত ডঙ্কা ঘৃণা ভালোবাসা আর আশঙ্কা, 
সঙ্গে যে হারিয়ে যাচ্ছে মৃত্যু বনের ঝোপে।

নিঃসঙ্গ রাত


                 ✍️দীলিপ মালাকার

যদি কোনোদিন তুমি
অভিমান ঝেড়ে আসো আবার ফিরে, 
এসে দেখবে তুমি
তোমার সাজানো প্রেম এখনো বেঁচে আছে  
মনের তেপান্তরে। 

আমি পারিনি ভুলতে তোমায়
তাই ধরিনি আর কারো হাত, 
তোমার অনুভূতিরা জেগে থাকে রাতের আঁধারে
তাই প্রিয় এই নিঃসঙ্গ রাত। 



শিক্ষকের প্রতি


                       ✍️নয়ন বর্মন

শিক্ষকতা পেশা নয়, এহা যেন নেশা 
ছাত্র-ছাত্রীরা আজীবন পায় নতুন জানার দিশা।।
শিক্ষক মোর পথ প্রদর্শক মোর প্রানের গুরু
জন্মের পর মায়ের দ্বারা  শিক্ষা জীবন শুরু।।

শিক্ষক জাগিয়েছে আমার আমিত্বের বাধ 
বিশ্বজগৎ  তাইতো পেল নবীনত্বের সাধ।।
শিক্ষা ছাড়া কেমন হবে জীবনরূপী বই
হয়তো বলবো মোর জীবনে সুখ গুলো কই?

শিক্ষাগুরুর স্পর্শে মোর জীবন গেল গুছে
সুখগুলো সব জড়ো হল দুঃখ-গেলো মুছে
গুরু তোমার কন্ঠে বেজে ওঠা সংগ্রামের ওই বাণী
সেই আদর্শে সাজিয়েছি মোর জীবন খানি

গুরুর শ্রমের ফসল ভোগে জীবন ভর
তাহাদের সম্মানে তাই ৫-ই সেপ্টেম্বর।।
গুনে স্পষ্ট আদর্শ বক্তা ও শ্রুতা
আরো স্পষ্ট আবেগপ্রবণ  শিক্ষাগত যোগ্যতা

শিক্ষকের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত জীবন
গুরুর ঋন চুকাবে না দিয়ে কোন ধন
শিক্ষক আজীবন অকৃপণতার সহিত বিদ্যাদানে রত
শিক্ষকের চরণে মোর শ্রদ্ধায় মাথা নত।।

বাবা


                   ✍️বিজয়া শর্মা

বাবারা কখনো ভালোবাসি বলে না, শুধু ভালোবেসে দেখায়। কখনো দামি পোশাক পরে না, একটা সস্তা মার্কা ঢিলঢিলে শার্ট হলেই চলে যায় গোটা কয়েক বছর। বিলাসিতা বলতে কিছুই নেই বাবাদের, সারাজীবন কেবল সঞ্চয় করে যান। একা খেতে গেলেও দেখি সস্তা হোটেল খুঁজে ডাল-আলুভাজা দিয়ে কোনোরকম পেট ভরলে চলে। হাঁটতে হাঁটতে ছিঁড়ে যাওয়া জুতোটাতে ও পেরেক মেরে চালিয়ে দেয় কয়েক মাস। বছরের পর বছর গেলেও বাবার হাত ঘড়িটার বদল হয় না। সংসারের ঘানি টানতে টানতে কষ্ট হলেও কখনো মুখ ফুটে বলে না বাবারা। সারাজীবন কেবল অক্লান্ত পরিশ্রম করে যায় পরিবারের জন্য। নিজের বিলাসিতার ভাগটাও তুলে রেখে দেয় স্ত্রী সন্তানের জন্য। বিশেষ ভাবে বাধ্য না হলে কখনো না বলে না। অথচ এই কিপটে সঞ্চয়ী মানুষটাই তার    পরিবারের জন্য একেবারে বেহিসাবী, বাবার বোধহয়             এরকমই হয়। পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে সামলাতেই চলে যায় পুরো জীবন। এই দুনিয়ায় হাজারো খারাপ পুরুষ থাকলেও, একটাও খারাপ বাবা নেই।

একটি অভিশাপ


                     ✍️অপর্ণা সিনহা

ঝাঁটা দিয়ে ঘর সাফ করতে করতে গৃহিণী হঠাৎ শুনতে পেলেন তীক্ষ্ণ স্ত্রী কন্ঠের ভৎর্সনা! 
- আরে আরে কি রে ! চোখের মাথা খেয়েছিস নাকি?
গৃহিণী প্রশ্ন করে,
 কে? কে বলছেন? তাছাড়া আপনি আমাকে তুই তুকারি করে বলছেন কেন?
স্ত্রী কন্ঠ বলে,
আঃ মরণ ! তুই তুকারি করে বলবো না তো কি পূজা করে বলবো, দেবী সম্বোধনে?
গৃহিণী আবারও বলে,
 আচ্ছা ঠিক আছে। যাই সম্বোধন করুন। কিন্তু আপনি কোথা থেকে কথা বলেছেন ? আর তাছাড়া এটা যে আমার বাড়ি!
স্ত্রী কন্ঠ অসহিষ্ণু হয়ে,
মরণ আমার! তোর বাড়ি তো আমি কি করবো? তাতে আমার বাড়ির দোষ কোথায়? বলা নেই, কওয়া নেই, তুই যে আমার এত বড়ো সর্বনাশ করলি! পোড়ামুখী!
গৃহিণী এবার খুব রাগান্বিত হয়ে বলে,
 আপনি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।এক তো আমার ঘরে আছেন লুকিয়ে তার উপর… .

কথা শেষ হতে দিলো না স্ত্রী কন্ঠ, চেঁচিয়ে উঠলো
 বলি চোখের তো মাথা খেয়েছিস! দেখছি তোর মধ্যে মায়া মমতার বিন্দু বিসর্গও নেই। না হলে, একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীর এমন সর্বনাশ করতে পারে কেউ?
গৃহিণী অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,
 আমি কি করলাম? সেটাই তো বুঝলাম না!
স্ত্রী কন্ঠ গজগজ করতে করতে বলল,
বুঝবিও না! বলি, এই আকাশ,বাতাস সব কিছুই কি তোর? এই পৃথিবীর সব কিছুতেই কি শুধু তোদের অধিকার? আমরাও তো এই পৃথিবীরই  জীব। তবে আমার বাচ্চাদের মেরে ফেলেছিস কোন আক্কেলে শুনি?কে দিলো এই অধিকার তোকে?
গৃহিণী হতবাক! বলল,
আপনার বাচ্চা? কোথায়? কখন মারলাম আমি?
স্ত্রী কন্ঠ নাকি গলা ভারি (কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল),
  দেখ্ ! ঐ নীচে পড়ে আছে আমার বাচ্চারা! তাদের ঝাঁটা মেরে প্রথমে নীচে ফেলে দিয়েছিস। তার পর পায়ে মাড়িয়ে চলে গেলি তুই !  ভালো হবেনা তোর বলে রাখলাম।দেখিস! হায় হায় বাছারা আমার..!
        গৃহিণী তখনই দেখতে পেল,একটি সাদা গোলাকার পিন্ড। বড় বড় মাকড়সার বুকে আটকে ধরে রাখতে দেখা যায় এমনি একটা।এটাই যে দেওয়ালে বসে থাকা প্রাণীটির বাচ্চারা, গৃহিণীর আর বুঝতে বাকি রইলো না। এমন হিংস্র ভাবে, মাকড়সাটি পাগুলো উঁচু করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিল, তাতে গৃহিণী কিছুটা অপ্রতিভ হয়ে পড়ে। আমতা আমতা করে বলে,
কিন্তু,আমি আমার ঘর সাফায় করছি। আপনাদের আমি দেখতে পাইনি। তাছাড়া কোন আক্কেলে ঘরের কোণে এমন বৃহৎ জাল পেতেছিলেন?নিজেই দেখুন কত আবর্জনা করেছেন।ওতে তো অনেক কীট পতঙ্গ আটকে মরে আছে। দুর্গন্ধে থাকা যাচ্ছে না ঘরে।

স্ত্রী কন্ঠ আবারও বলে
 আচ্ছা! দুর্গন্ধ পাচ্ছিস তুই?আরে ওতে আমার সারা বছরের খাদ্য মজুদ ছিল!এক লহমায় সব শেষ করে দিলি? তুই রাখিস না খাদ্য? সারা বছরের জন্য তোরা মানুষেরা ঘোলা ভরে ধান,গম,আলু পেঁয়াজ রাখিস না বুঝি? তোর বর কি প্রয়োজনের বেশি টাকা মজুদ রাখেন না ব্যাঙ্কে? পৃথিবীর মাটি,জল দখল করে তোরাই তো চাষবাস করে সব নিজেদের জন্য রাখিস?ফ্রিজ ভরে শাক সবজি মাছ , রাখিস না? সেটাতে দোষ নেই ! আমি  আমার সন্তানের জন্য সামান্য কটা কীট পতঙ্গ রাখলে অপরাধ হয়ে যায়? তোদের মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়।জানিস কত কষ্টে তিল তিল করে জাল বুনে সেগুলো আটকানোর ব্যাবস্থা করেছিলাম আমি। মাগী নিজের বেলায় ষোল আনা বুঝিস।তোরা মানুষেরা অন্য কারও ক্ষুধা তৃষ্ণা ,কষ্ট কখনও বুঝিস না!

হতবাক গৃহিণী কথা বলতেই পারছিল না।
তাকিয়ে ছিল ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে!ভাবলো,শেষে কিনা এই ক্ষুদ্র জীব তাকে তর্কে হারিয়ে দেবে? কিছু তো বলতেই হবে ভেবে,বললো
তোমার ঐ বিশ্রি জালে দেখো,কী সব আটকে আছে!মৃত চপা কীট, এছাড়া লাশের সাথে সংসার করছো তুমি। তুমি ছাড়া আরও দুটো তোমার মতো জীব ওতে। তার একটা জীবন্ত। একটা মৃত । তবে মৃত জীবটাও তো তোমার মতোই। এত কী তোমার খিদে? নিজের প্রজাতিও ? ছিঃ!

স্ত্রী কন্ঠ রাগে দুঃখে
   (ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে) কেন?তোরা রাখিসনি অতিরিক্ত জমা? অতিরিক্ত সম্পর্ক? আমি সব জানি। দেখিও! আমার সাথে সতীপনা দেখানোর দরকার নেই। তবে শুন্ ,আজ যেমন অতিরিক্ত ঝঞ্ঝাট ভেবে ধ্বংস করে দিলে আমার সংসার; কাল একজন তেমনই তোদেরকেও অতিরিক্ত ঝঞ্ঝাট ভেবে ছেঁটে ফেলে দিবে এ গ্রহ থেকে!

গৃহিণী হতবাক হয়ে বলে
   মানে কি? কি বলতে চাইছো তুমি?
কখন যে তর্কেতর্কে গৃহিণী আপনি থেকে তুমিতে নেমে গেছে সে টের পায়নি।
স্ত্রী কন্ঠ বলে,
 মানে কিছুই না। তোরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব ভাবিস তো নিজেদের। একদিন তোদের লোভ,আগ্রাসী মনোভাব, অন্য জীবেদের প্রতি অসহিষ্ণুতা, অতিরিক্ত জমানোর নেশার পাপ, এই সব কিছুর জন্যেই পতন হবে তোদের এই সভ্যতা!

গৃহিণীও ছাড়বার পাত্রী নন,সে বলল,
 তোমার মুখের কথায় নাকি? জানো কত মজবুত আমাদের ঘর? আমাদের (কথা থামিয়ে দিয়ে,) 

 স্ত্রী কন্ঠ বলে,
তোদের! তোদের কি? তোদের সম্পর্ক গুলো কি ততটা মজবুত? যেমনটা তোদের বাসস্থান? যে, প্রকৃতির শক্তি,তান্ডবকেও ভয় করিস না? এত স্বার্থপরতা, লোভ বিশ্বাসঘাতকতা তোদের রক্তে ! ধ্বংসই হবি তোরা!

গৃহিণী নিজেকে সামলে বলে,
 সে না হয় হলো। কিন্তু ঝাঁটা মেরে আমাদের ধ্বংস করে, এমন কি কেউ আছে?

স্ত্রী কন্ঠ বলে,
 আছে ! আছে বৈকি। তোদের জন্যই তো পৃথিবীটার আজ এই অবস্থা। তোদের জন্যই বন্যা,খরা, তোদের জন্যই শ্বাস বায়ু দূষণ। তোদের জন্যই তো আমাজন শেষ হয়ে গেল। তোদের জন্যই সুনামির তান্ডব।এই ধ্বংসের দাবানল থেকে একদিন তোরাও মুক্তি পাবিনা!

গৃহিণীও
 (রেগে গিয়ে বলে) ওওও অভিশাপ দিচ্ছ  আমাদের ! হা হা হা হা !  মানুষদের?এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীবদের? তোমার তো সাহস কম নয়? তোমার মতো একজন পরজীবী তুচ্ছ কীট!(বলে হাসতে থাকে গৃহিণী)

স্ত্রী কন্ঠ সাথে সাথেই বলে,
  হ্যাঁ,দিচ্ছি তো অভিশাপ!তবে তার জন্য  নয় । তোদের ধ্বংস তোদের কর্মেই হবে।


   গৃহিণী ভাবলো, এত তুচ্ছ, ক্ষুদ্র কীটের (সামান্য এক স্ত্রী মাকড়সার) আজেবাজে কথা শুনছে কেন সে? তার তো, এতো সময় নেই। তাছাড়া তর্কে এর কাছে হেরে যাওয়ার চেয়ে … … .! কিছুক্ষণ ভেবে মনে মনে ভাবলো,
ঠিকই তো! তার অজান্তেই মেরে দিলেই তো সব শেষ! যেমন ভাবা তেমন কাজ! হঠাৎই ঝাঁটা শক্ত হাতে ধরে, দিল এক প্রহার! সাথে সাথে দেওয়ালে বসে এতক্ষণ অভিসম্পাত  বর্ষণ করতে থাকা স্ত্রী চরিত্রটি লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে! মনুষ্য গৃহিণী যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো! আর এক কুটিল হাসি হেসে সংসারে মন দিল।


অবশিষ্টাংশ


                 ✍️অপর্ণা সিনহা

যেতে যেতে একটু খানি ছাই, 
একটু জল আর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া
কিছুই তো রেখে যাবার নেই!
সোনার পালঙ্ক, সুন্দর মুখশ্রী
মসৃণ ত্বক সব নিমেষেই উধাও হবে।
সাথে হয়তো অল্প মাটি পড়ে থাকবে 
দূরের কোনো নদীর তীরের শ্মশান ভূমিতে।
তোমারও প্রাপ্তির কিছু নেই তাতে,
শুধু একটু মিথ্যে অহংকার ও কিছু
অপ্রকাশিত পাপ ছাড়া অবশিষ্ট-
পায়ের নিচে এক টুকরো কয়লাও না।
নদীর জলে তলিয়ে যাবে প্রায় সবই,
তার সামান্যই সাগরে মিশে আমার গান হবে,
বাকি সমস্তই বেসুরো জীবন মাত্র!
                              

সমর্পিতা


                 ✍️মধুমিতা চৌধুরী বর্ধন

আমি ...
শুধু আমি আশ্রিতা
চিরদিন 
তোমাদের ঘরে
আমি লালিতা ও পালিতা
এই পৃথিবীতে
কিন্তু তোমাদের তরে
আমি সয়ে থাকি
 সকল দুঃখ কষ্ট নীরবে 
ফোঁটা ফোঁটা  অশ্রুজল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে
তোমাদের সুখে কখনো বা দুঃখে
আমি হই সমসাথী
আমি কোমল
 অতি অভিমানী
লুকিয়ে রাখি সযত্নে
সকল রহস্যের উত্তর
আমি দিই  মরুতে প্রাণ
ঝরে পরি বৃষ্টি হয়ে
শুষ্ক মাটিতে
আমি নারী
এসেছি ধরায়
বিলিয়ে দিতে প্রেম
তোমাদের তরে