ত্রিপুরার গভীর অরণ্যে অনন্ত ঐশ্বর্যের প্রতিষ্ঠান-


                   ✍️ সুজিত ভৌমিক

যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয়- 'ত্রিপুরাকে কেন ভালো লাগে '? ত্রিপুরার মূল আকর্ষণ কি বা মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুই কি?' ত্রিপুরার প্রকৃত ও মূল বৈশিষ্ট্যই বা কোথায় অথবা ত্রিপুরা কিসে শ্রেষ্ঠ? ' উত্তরদাতা যদি বিদেশি তথ্য ফরেনার হয় তবে হয়তো বলবেন, ''Tripura is best in It's forest'।  অথবা বলে বসবেন, 'The forest of this state is dense and unique ''। কোন বহিঃরাজ্যবাসী ভারতবাসী হয়তো বলবেন 'ত্রিপুরার অরণ্যের তুলনা নেই।' আর এ রাজ্যের কাউকে তথা ত্রিপুরাবাসী কোন একজনকে  প্রশ্ন করলে- 'ত্রিপুরার শ্রেষ্ঠ সম্পদ কি? অমনিই, তৎক্ষনাৎ চোখবুঁজে একটি ও একমাত্র উত্তরই আসবে। আর সে জবাবটি বা উত্তরটি হল, ' অরণ্য সম্পদ।' আবেগ তাড়িত হয়ে কেউ হয়তো বলবেন, 'ত্রিপুরার একমাত্র সম্পদ অরণ্য সম্পদ।' ত্রিপুরার একমাত্র ঐশ্বর্য অরণ্য ঐশ্বর্য। 

   আর বলা বাহুল্য, অরণ্য অভ্যন্তরে বা বনের স্পর্শে যাদের বাস, বিশেষ করে যে সমস্ত উপজাতি অংশের মানুষজন অরণ্যবাসী, তাঁরা যদিও আংশিকভাবে বা সম্পূর্ণভাবে অরণ্য, গাছপালা, বৃক্ষ ইত্যাদির উপর নির্ভর করেন, অরণ্য উদ্ভিদের ফল, মূল, পাতা, শুকনো জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ, গৃহের পরিকাঠামো ও আচ্ছাদনের জন্য, পশুপালনের জন্য, বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ ও রোগপীড়াতে ভেষজ উদ্ভিদাদির ছাল, পাতা, ডাল ও পুষ্প, ফল ও মূলের নির্যাস সংগ্রহ ইত্যাদির জন্য অরণ্য অভ্যন্তরের গাছপালা ও বৃক্ষাদির উপর নির্ভরশীল, তবে একথা অনস্বীকার্য যে তাঁরা বন, অরণ্য, বৃক্ষ ও উদ্ভিদকে গভীর ভাবে ভালবাসেন, বনের বৃক্ষাদির প্রতি প্রীতি,  বনবাসীদের সবুজ গাছপালার প্রতি গভীর অন্তরের টান, প্রাণের আকর্ষণ ও হৃদয়ের উষ্ণ ভালবাসা। নয়তো তাঁরা কিন্তু সংখ্যক হলেও অরণ্যভূমি ছেড়ে বনের ঠিকানা ত্যাগ করে মলস্রোতে সামিল হতেন, কিছু বা স্বল্প সংখ্যায় হলেও লোকালয়বাসী বা গ্রামবাসী হতেন, বা শহরের চাকচিক্য বা সুযোগ সুবিধা, আরাম আয়েশ ও বিলাসিতার অংশীদার হতেন। সুতরাং যারা বনবাসী, অরণ্য অভ্যন্তরের যাদের বাসস্থান, তাঁরা অরণ্য ও বৃক্ষাদিকে অতি কাছের বস্তু, অতি বিশ্বস্ত  ও আপনজন, অন্তরের ভালোবাসার ঐশ্বর্য্যে লালন করা স্বর্গসুখ বস্তু, দুর্লভ সুখের ধন হল এই বন ও অরণ্য। একথাই আসল সত্য যে, অরণ্য ও বনবাসীরাই অরণ্যকে সবচেয়ে বেশী ভালবাসেন। যাইহোক, ত্রিপুরার অরণ্যের হাতছানি অন্তহীন, সীমাহীন ও দুর্বার। ত্রিপুরার অরণ্যের গভীরতা, সতেজতা, দুর্ভেদ্যতা, সবুজের অবিচ্ছিন্নতা, বিচিত্র সব পাখিদের কলকাকলি ভরা ছন্দের উদ্দামতা, সীমাহীন সবুজের মোহময়তা, বিচিত্র সব গাছগাছালির রহস্য ও রোমাঞ্চ যেন এক অন্যবিল আনন্দ, এক স্বর্গীয় অনুভূতি, একবুক বাতাস, উদাসীন সনের ঠিকানা খুঁজে পাওয়া আর ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে যাওয়া মন জঙ্গলের ঘোর আবর্তে, গহন বনের নিঃঝুম, নিঃশব্দ শীতলতায় এ যেন নতুন করে নিজেকে খুঁজে পাওয়া, মন হারানো বনের সবুজে মুক্তির স্বাদ, অনন্ত শান্তির বার্তা, স্বর্গীয় সুষমার হাতছানি। আর ত্রিপুরা অরণ্যেই এই বৈচিত্র্য ও বিভূতির প্রকাশ৷ ত্রিপুরার অরণ্য তাই অনন্য। 

  উল্লেখ্য রাজন্য আমলে এরাজ্যে 'হাতি খেদা' নামে একটি শব্দবন্ধ তথা মজাদার ও ঐতিহাসিক শব্দযুগলের কথা জানা যায়। এ রাজ্য থেকে তখন বহিঃরাজ্যে হাতি বিক্রি করে বিশাল অঙ্কের অর্থ আয়ের উৎস স্বরূপই এই 'হাতি খেদা' অভিযানের সূচনা হয়েছিল। ১৯৭৮ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায় এই রাজ্যে তখন হাতির সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫০টির মতো। দক্ষিণের গোমতী, অমরপুর, বামপুর, উত্তরের মনু, আমবাসা ও তেলিয়ামুড়ার নিকটবর্তী অঞ্চলে হাতিদের আনাগোনা ছিল সর্বাধিক ও লক্ষণীয় ভাবে উল্লেখযোগ্য। এ রাজ্যে প্রায় ১৫৪৫ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে ।  অরণ্যাঞ্চলের পরিধির বিস্তৃতিও ছিল খুবই সন্তোষজনক ও সর্বোচ্চ মাত্রা বিশিষ্ট। বলা যায় গভীর, গহন, ঘন জঙ্গলে আবৃত ছিল ভারতের বৃহৎ অংশের ভূমি অঞ্চল। যেমন খ্রীস্টপূর্ব প্রায় ৩০০০ বর্ষ নাগাদ ভারতের মোট ভৌগোলিক আয়তনের ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ অঞ্চল ছিল অরণ্যাবৃত। আর ১৯০০  খ্রিস্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত ছিল ৪০ শতাংশ বনাঞ্চল। ১৯৫১ সালে তা নেমে যায় ২২ শতাংশে,
 আর ১৯৯৫ সালে বনাঞ্চলের পরিমাণ দাঁড়ায় কমবেশি প্রায় ১৯৩৯ শতাংশে।

    উল্লেখ্য, ত্রিপুরা রাজ্যে ২০০৩ বন সমীক্ষা অনুযায়ী বনাঞ্চলের আয়তন ৬২৯৪.২৯৩ বর্গকিমি এবং বৃক্ষ রয়েছে এখন এলাকার পরিমাণ ৮০৯৩ বর্গকিমি। প্রায় ৩০৪৭ বর্গকিমি জুড়ে রয়েছে উন্মুক্ত বন। উল্লেখ্য, ভারতের উদ্ভিদ সাম্রাজ্যের ১২.৮৬ ভাগ উদ্ভিদ এর আবাসভূমি হল এই ত্রিপুরা। যদিও মাথাপিছু বনের পরিমাণ তথ্য বনভূমির আয়তন (per capita area of forest land)- এর ক্ষেত্রে পৃথিবীতে সবচেয়ে নিম্নে হল ভারত। আর বর্তমানে পৃথিবীতে বনভূমি হ্রাসের বার্ষিক হার ১.৭ মিলিয়ন হেক্টর। উল্লেখ্য, উদয়পুরস্থিত জগদ্বিখ্যাত, সতীর একান্ন পীঠের একটি, মাতা ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির সংলগ্ন বৃহৎ দীঘি কল্যাণ সাগরে বিরল প্রজাতির কচ্ছপ বর্তমান। এই বিরল প্রজাতির কচ্ছপগুলি বৃহদায়তন ও বয়সে অতিপ্রাচীন  এবং পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। পরিশেষে বলি ত্রিপুরার অরণ্যে রয়েছে সাক্ষাৎ বনদেবী (Living Goddess of forest) এর অবস্থান ও অধিষ্ঠান। ইংরেজ দার্শনিক ও মনীষী তথা বিখ্যাত লেখক Francis Bacon (1561-1626, English Politician, Philosopher, and essayist) এর গুরুগম্ভীর ও প্রগাঢ় তাৎপর্যপূর্ণ উক্তি দিয়েই এ নিবন্ধের ইতি টানছি। Francis Bacon বলেছেন, 
" God Almighty first planted a garden ; and indeed, it is the purest of human pleasure. "

তোমার চরণতলে (গান)


                 ✍️প্রসেনজিৎ পাল 

তোমার চরণতলে পাই যেন গো ঠাঁই, 
তোমার নামে, তোমার গানে তোমারেই যেন পাই।
দিন ফুরাল, রাত্রি গেল কত জনম ধরে, 
তোমায় পাবার স্বপ্ন তবু আছে হৃদয় জুড়ে। 
জানি প্রভু ধরা দেবে একদিন তুমি 
যেদিন পূর্ণ হবে পুণ্যে আমার হৃদয়ভূমি।
এই আশাতেই আছি আনন্দে ইচ্ছে হবে পূরণ, 
পাব পাব কোন এক নিশিদিনে তোমার রাঙা চরণ।

দেশহীত


                     ✍️পান্থ দাস

হলেন শহীদ 
শত শত অমর কিশোর,
হে বীর প্রসবিনী
ভয়টা কি তোর !

দেশ প্রেমের 
অবাধ সাধনায়,
ধ্যান জ্ঞান কি আর
বৃথা যায় !

যায়না যে ভোলা
তোমাদের রক্তে রাঙা
জাতীয় পতাকা,

দেশহীতে যে দিলেন 
ভরা যৌবন 
চাইতো যে শুধুই একতা ।

রাজনৈতিক দলগুলোকে সাজেশন


                  ✍️ রাজা দেবরায়



প্রায় সব রাজনৈতিক দলগুলোরই যুবশক্তি বা ইওথ উইং বা সংগঠন আছে। কিন্তু এগুলোতে শুধু রাজনৈতিক চর্চা (সেটাও সঠিকভাবে হয়না) বা কর্মসূচী প্রতিপালনই মূখ্য ব্যাপার থাকে। যুব মানে তো বিশাল কিছু। যুব মানে প্রেম, যুব মানে আবেগ, যুব মানে নতুন ভাবনাচর্চা, যুব মানে নতুন সৃষ্টি, যুব মানে নতুন সংস্কৃতি, যুব মানে নতুন দিশা, যুব মানে নতুন দৃষ্টিকোণ!

কিন্তু এগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার চিন্তাভাবনা কি রাজনৈতিক দলগুলো করছে? মনে তো হয়না! যুবদের মিটিংয়ে কেনো প্রেম, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, সিনেমা, গান ইত্যাদি বিষয় থাকবেনা? এগুলো থাকলে তো এগুলোর চর্চার মাধ্যমে নেতৃত্বরা আগামীদিনের সঠিক, যোগ্য, উৎকৃষ্ট নেতৃত্ব সহজেই খুঁজে নিতে পারবেন। শুধুমাত্র রাজনৈতিক কথাবার্তার মধ্যেই সীমিত না রেখে একেক দিন একেক বিষয়ে সবাইকে আলোচনা করতে দেওয়া হোক। তাঁদের কাছে প্রেম আসলে কী, সেটা তাঁরা মন খুলে বলুক। কেনো এই গায়কের গান ভালো লাগে মন খুলে বলুক। কেনো এই খেলা ভালো লাগে বা এই খেলোয়াড় ভালো লাগে বলুক। সাহিত্য, খেলা, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে ডিবেট হোক। ডাটা কালেকশন করে তুলনামূলক বিশ্লেষণ হোক। তবেই তো তাঁদের মনে যুক্তি, দৃষ্টিভঙ্গির খেলা চলবে। বিভিন্ন বিষয়ে বন্ধুত্বমূলক প্রতিযোগিতা হোক নিজেদের মধ্যে। সৃজনশীল উৎকর্ষতা আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসুক এবং বৃদ্ধি পাক তাঁদের মধ্যে। তবেই তো আমরা ভবিষ্যতে দারুণ রাজনীতিবিদ পাবো।

এছাড়া শিক্ষা নিয়ে আলোচনা হোক। শিক্ষাকে আরো উন্নত করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার আলোচনা হোক। যদি ভালো প্রস্তাব পাওয়া যায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়া হোক। এইরকম নানা বিষয়ে আলোচনা, পর্যালোচনার মাধ্যমে জনগণের সুবিধে হবে এরকম বিষয় নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে প্রস্তাব দেওয়া হোক। তারপরে এই যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাবগুলো জনসমক্ষে আনা হোক। রাজনৈতিক স্বার্থে শুধুমাত্র ধর্ণা বা একদল লোক নিয়ে ডেপুটেশন এই জিনিসগুলো এখন মানুষ সেইভাবে পছন্দ করেননা। তাছাড়া এগুলো দেখতে দেখতে একঘেয়েমি লাগে জনগণের। কেনোনা নির্দিষ্ট বিষয়ে এগুলো করার পর আর কিছু জানা যায়না এবং ফলো-আপ করা হয়না। তবে অবশ্যই এইসব নিয়ে রাজনৈতিক চর্চা, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, গবেষণা, আলোচনা, সমালোচনা ইত্যাদি হোক।

যেকোনো রাজনৈতিক দলেরই মুখ্য উইং হলো যুবশক্তি। ফলে তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সুশিক্ষিত করার জন্য সঠিক অর্থে পদক্ষেপ গ্রহণ করা মূল কর্তব্য অবশ্যই রাজনৈতিক দলগুলোর। তবেই রাজনৈতিক দলগুলো সত্যিকার অর্থেই সঠিক পথে ধাবিত হবে।

রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে দোষারোপ করার চাইতে গঠনমূলক সুপরামর্শ বা সুচিন্তা প্রদান করলে সেটা জনগণের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য হবে। তবে উপযুক্ত তথ্য, প্রমাণ সহ শাসক দলের বা সরকারের ভুল পদক্ষেপগুলো তো অবশ্যই বিরোধী দলগুলো ধরিয়ে দেবে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে এবং আন্দোলনের মাধ্যমে। অনেক সময় আমরা এগুলো দেখেও থাকি।

পরিশেষে এটাই বলার, আগামী দিনে রাজনৈতিক দলগুলো উপযুক্ত নেতৃত্ব উপহার দিক আমাদের। আর শুধু এইটুকুই চাওয়া যে আগামী দিনগুলোতে রাজনীতি একটু হটকে, গঠনমূলক, ইতিবাচক এবং শান্তিপূর্ণ হোক।

'স্বরূপ'

               ✍️ দিব্যেন্দু নাথ

- আমি যদি আবার নাইনের ছাত্র হই, তুমি কি  সেভেনের ছাত্রী হবে?
- না। 
- কেন?
- দাদাদের মাঝে! দাদা দাদা বলে আবার তোমাকে খোঁজাবো?
- এও তো ঠিক! তবে এখন পর্যন্ত তো সেই দাদা-ই ডাকো।
- সে তো তোমার জন্য!
- এছাড়া আমার আর কি করার ছিল?
- হ্যাঁ। পালিয়ে গিয়ে বংশের আভিজাত্য বাঁচানো-ই ছিল তোমার সঠিক সিদ্ধান্ত।
- যাইহোক! সাতকাহন গল্পের পর তো এখনও একটা সম্পর্ক টিকে আছে। কথাটা শুনে আঁখির এতদিনের শুষ্ক বাঁকা নয়ন বেয়ে দু-ফোটা অশ্রু টপ-টপ করে ঝরে গেল। স্বাভাবিক ভাবে বলতে চাইল, পরল না। অনেকটা গোঙানির মতো আওয়াজ বের হল গলা থেকে, - আমার অভিমানটা কোনদিন বুঝতে পারোনি তুমি।
- কে বলল সে কথা?
- কেন টুপুর পরতে গেছিলে আমাকে রেখে?
- সেদিন তো তুমি পরিস্কার-ই বলে দিয়ে ছিলে...!
- পেছনটায় কে ছিল! মনে আছে? 
- আছে।
- আমি আর মনের প্রলাপ ছড়িয়ে লোক হাসাতে চাই না দিব্যদা। অধরা ব্যথায় আক্রান্ত আঁখি একটু মুচকি হাসি দিয়ে আবার বলল, - সমাজের মিথ্যে অহমিকায় ভরা আমার দাদা! কেন যে নিজকে এত সংস্কারসম্পন্ন মনে করে। এবার যেন দিব্যর গলাটা কেঁপে উঠল। তবে সেটা ভয়ে নয়! হারানো বিরহে।
- তুমিও তো সায় দিয়ে ছিলে দাদাকে।
- এছাড়া কি করার ছিল আমার! 
- প্রতিবাদ করা।
- তোমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অবলা নারীর কণ্ঠে কি এত সাহস আছে?
- পক্ষে একটি মাত্র ধনাত্মক সংকেত দিতে আমাকে, দেখতে কি করি!
- মারডাঙা করতে?
- করতাম।
- লোকে হাসতো! ভালোবাসায় হিংসা...। কথা বলে আঁখির চোখমুখ উদাস হয়ে যায়।
- তুমি রাধার অন্তর, পিঞ্জরে নিয়ে জন্মিলেও... আমিও কিন্তু কৃষ্ণর মতো প্রভাস নদীর পারে বসে আছি এখনো...।
- ছাড়ো না গো বিরহ! কি আর হবে এসব ভেবে। আমার তো ঠিকানা-ই বদলে গেছে।
- হ্যাঁ। তুমি তো মায়ের তকমায় রঞ্জিত হয়ে গেছো।  পৃথিবীতে এই একটাই সম্পর্ক আছে সব সম্পর্ককে  ফিকে করে দেওয়ার জন্য। 

এবার মৌনতা আকড়ে ধরে আঁখিকে। বিষ্ময় না আকুলতায় ছেয়ে গেছে, বুঝা গেল না। প্রলাপ সুরে  বলতে লাগল দিব্য, - আমিও চাই না.... মা সম্পর্কটা কোনো দিন পৃথিবীতে কুলোষিত হোক। সহজ পৃথিবীর জটিল করা নিয়মানুযায়ী তো, ভুলটা সবসময় পুরুষদের-ই হয়! এই কলঙ্কটা আমারই থাক! অশ্রু পান করতে শিখে গেছি এখন। চোখের জল ছাড়া সমাজের সমস্ত ভার বইতে পারি। 
- হ্যাঁ গো। মেয়েরা তো কেঁদে হালকা হয়, লোকসমক্ষে। পাঁচমিশালি আহা-উহু তাও পাওয়া যায় শ্বান্তণা স্বরূপ! তাতে যদিও দুঃখ কমে না। কিন্তু সমব্যথী ধরে নেয়া যায়। অথচ পুরুষদের এমন এক যোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করে রাখে 'সময়', যেন কাঁদাটাও লজ্জার। ওদেরও মন আছে, স্বাভাবিক কান্না আছে এটা মনে-ই থাকে না। মানসিক নির্যাতনে পুরুষরাই বেশি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। আঁখির কথা শুনে অজস্র দুঃখের মাঝে পুলকের ছোঁয়া পেল  দিব্য। কেমন জানি বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আঁখি আবার বলতে লাগল, - মৌনব্রত ভেঙে ফেলো। বেশি চুপ থেকো না! তোমার কথা মতো বেনারসি পড়েছিলাম ঠিকই। ভেবে না তাতে তুমি 'দোষী' এটাই আমাদের ভাগ্য ছিল। আজ যে অবতারের পূজা করছি! গোপনে তুমিই তো ঢেলে দিয়েছো হাতে ফুল। 

দিব্য পুরুষ হয়েও ভুলে গেছে, সে পুরুষ; বাউল হয়ে ভুলে গেছে তার স্বরূপ। না হলেও কি দুচোখ একসাথে ভেঙে গলে যেত! বাউল ধর্মে কারো প্রতি কোনো খেদ থাকতে নেই। তবুও কেন জানি আঁখির বারবার মনে হচ্ছে, দিব্য পথ ভ্রান্ত...!! প্রশ্নটা করবে কি করবে না, না ভেবেই সুধালো, - আজ একটা সত্য বলবে?
- কি গো?
- আমারে সংসারি বানিয়ে তুমি কেন বাউল হলে!
- ওঃ, সে-কথা! উত্তর জানা প্রশ্নটা করে কেন লজ্জা দিচ্ছো। 

আঁখি নীরব হয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য। বিনয় ভরা বিলাশিতার হাসি দিয়ে বলে, - ইজ্জত! সেটা বাঁচাতেই তো এখনো দাদা বলে ডাকি...। নাহলে তোমার সঙ্গী হয়ে চলে যেতাম সাধন মার্গে। কথাটা দিব্য না শুনলেও অনুমান করতে পারল। মনে মনে বলল, - তোমার ওজন এত বেড়ে গেছে যে; আর পারছি না! বুকে নিয়ে বইতে...।

স্বাধীনতার সোপান


            ✍️মণীষা গুপ্ত পাল 
 
দুশো বছরের ইংরেজ শাসনের পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্তি পেল যেদিন আমাদের দেশ মহান ভারত বর্ষ --
সে দিনটা ছিল চিরকাঙ্ক্ষিত, বিপ্লবীদের দীর্ঘ লড়ায়ের সুফল, মুক্তির সুখ ।
অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে যারা সেদিন স্বাধীনতা এনেছিল বুকে করে ,
স্বাধীন দেশের স্বপ্ন নিয়ে অকালে তাদেরই প্রাণ ঝরে ছিল।
 কত মায়ের মমতার বন্ধন ছিন্ন করার কাহিনী,
 কত মেয়ের আত্মসুখ বিসর্জনের গল্প-
 ইতিহাসে আজও অমলিন।

 সময়ের সোপান বেয়ে আজ আমরা স্বাধীন ,
স্বাধীনতা দিবস আমাদের জাতীয় উৎসব।
 কিন্তু আমরা কতটুকু হয়েছে স্বাধীন? অপেক্ষার চাদর বিছিয়ে আজও আছি মুক্ত আকাশ দেখার জন্য।
 এসো, আজ শেষ শ্রাবণে মুক্তির বারিধারায় স্নাত হই আরো একবার, স্যালুট জানাই সেইসব আত্মত্যাগীদের, সেইসব মহান সংগ্রামীদের  ,যাদের ত্যাগ ও তিতিক্ষায় পরবর্তী প্রজন্ম মুক্ত আকাশ পেয়েছে।

ভালোবাসার বাড়িতে

 
               ✍️চিরশ্রী দেবনাথ

ভালোবাসা খুব একা হয়,
যারা ভালোবাসা ভেবে গোলাপ দিচ্ছে    
তারা এখনো জানে না, গোলাপের নিচে নীরবতার সাম্রাজ্য
আগামীতে তারা একা হেঁটে যাবে বলে
তৈরি হচ্ছে শহর, পার্ক, ফুলের দোকান    
এ পথে আমি যখন যাবো, তখন তুমি হেলায় ওড়াচ্ছ স্মৃতি
শীতের ধুলোলাগা পাতার মতো সেসব স্মৃতিস্মারক আমার অসুস্থতা, 
তবুও আমি এখন খুব নিশ্চিন্ত,
হারিয়ে ফেলার পর আর ভালোবাসা হারানোর ভয় থাকে না
আমরা আর একে অপরকে দিব্যি দিই না
আমাদের কল্পনার বাতাসবাড়িতে 
এখন অজস্র দোয়েলপাখির মেলা বসেছে, গানের জলসা
 গোলকধাঁধায় পড়ে, সেই বাড়ি ছেড়ে এসেছি দুজনেই
তাতে হিমেল বাতাস বইছে , রোদের আহ্লাদ
তুমি বন্ধুর কাছে গল্প করছো, প্রেম হলো 'ন্যাকামো '
তাই এসবে হাসি পায়, তার চাইতে অনেক ভালো আছো এখন। 
আমি বন্ধুর কাছে গল্প করছি, ভালোবাসা বলে কিছু হয় না
পুরোটাই  ' ইগোসেন্টার্ড '। 
আসলে ভেতরে ভেতরে ভেঙে যাচ্ছি দুজনে
সেই ভাঙন ঢাকতে, আমরা আত্মহত্যার ঘটনাকে হেরে যাওয়ার গল্প বলে ঘেন্না করি, 
পৃথিবীতে কেউ চলে গেলে, তাকে ছাড়াও আছে বেঁচে থাকার
অজস্র জলঠিকানা, 
একথা আমি কোথায় যেন এইমাত্র বলে এলাম উল্লাসে। 
আমাকে ঢাকতে আমি উজ্জ্বল পোশাক পরছি
তোমাকে বিস্মৃত হতে ভ্রমণে যাচ্ছি পাহাড়ে সমুদ্রে
আমার  আংটির নীলাভ পাথর থেকে গড়িয়ে যাচ্ছে তোমার রঙ
তাতে চুম্বন নেই, শ্রাবণ নেই, নেই চোখের ওপর চোখ রাখার অমোঘ তুর্যনাদ
কিন্তু গোপনে খোঁজ রাখছি তোমার
তোমার দেহে কী তেমনি ধাতব ঔজ্জ্বল্য 
চশমার পাওয়ার বেড়ে, চোখ হয়েছে আরোও আবেদনময়
কারা কারা তোমার জন্য মুগ্ধ হয়? সেইসব শুকনো নদীতে কী তবে আমার ছেড়ে আসা জোয়ার?
একসময় আমরা ক্লান্ত হই
প্রতিটি দিনের মধ্যে যে গভীর একটি দিন আছে, সেখানে
এসে দাঁড়াই।

কোথাও কেউ নেই, আমাদের ছেড়ে চলে গেছে পৃথিবী
আমরা মৌন বিষাদের মতো নিজেদের গিলছি
অথচ আমাদের বাতাসবাড়িতে ভালোবাসার উৎসব হচ্ছে ...
সেখানে তোমার ও আমার নামে আসেনি কোনো আমন্ত্রণ।

তারাও স্বাধীন হোক

 
         ✍️সুমিতা স্মৃতি

তুমি দেশভক্ত দেখছো আর আমি দেখেছি কতগুলো ক্ষুধার্ত লোক। 
তোমার আজ স্বাধীনতার দিন আর অসহায়দের শোক।। 

তুমি গায়ে রঙ মাখছো গেরুয়া, সাদা, সবুজ। 
কিন্তু তারা পেটের দায়ে শহরতলীতে ঘুরছে রোজ রোজ।। 

তোমার কাছে স্বাধীনতা মানে জাতীয় পতাকা উড়ানো। 
তাদের কাছে স্বাধীনতা মানে দুমুঠো খাবার জুটানো।। 

তোমার কাছে কতশত স্লোগান জয় হিন্দ আরও কতকি । 
তাদের মুখে একটাই স্লোগান বাবু একটু খাবার দেবে কি? 

তোমরা আজ দেশ জুড়ে তুলছো বিজয় ধ্বনি। 
তাদের চোখেমুখে আজও ক্লান্তি, হয়তো খাবার মেলেনি।। 

চোখ তুলে দেখো তাদের তারাও এদেশের'ই লোক। 
তবে আজ স্বাধীনতার দিনেও তাদের কেন শোক?