চাষী বন্ধু


✒️মাধুরি লোধ

আমার মনে খুশির জোয়ার
    ধান ফলেছে মাঠে
ধান কাটবো চাল করবো
  বেচতে নেবো হাটে ।
রুটি রুজি চলবে আমাদের
  মিটবে অন্ন ভাবনা
হবে না আর অনাহারে মরন
   পূর্ণ হবে মনের বাসনা ।
দেশের জন্য দশের জন্য
   খাটবো রোদে জলে
শষ্যশ্যামলা মাঠ হবে
 ভরবে ফুলে ফলে ।
 হেসে বলে চাষী বন্ধু 
  আমরা খাদ্যের জোগানদার
  গর্ব করে বলতে পারি আমরা
জোগাই মানুষের জন্য ফলাহার ।

পড়ন্ত সূর্যের আহ্বান

✒️মিঠু মল্লিক বৈদ‍্য

ও নতুন শুনছো-
শুনছো আমার ডাক?
আমি শেষ চৈত্রের পড়ন্ত সূর্য।

আগামীর ভোরে উঠবো যখন 
নূতন আশার আলো ছড়িয়ে,তোমায় সবে করবে বরণ
প্রদীপে আর মঙ্গল ঘটে, 
বাংলার পথে পথে শুনবো বৈশাখের নব আহ্বান।

 নতুন, তোমায় ওরা ভাবতে চায় উদারতায়
স্বপ্ন দেখে সফলতার,
ব‍্যর্থতার জরতা আমার বুকে করে সমর্পণ,
হতাশার ক্ষতে আগুনি রঙ্গে টানে প্রলেপণ।

তাই বলছি শোন আমার ডাক,
অতীতের সব কালোছায়া ভুলে
নব আলোয় ভরিয়ে তোল পৃথিবী
সুখদুয়ার খুলে জড়িয়ে নাও বুকে।

অভাব যত ঢেলে দাও দিগন্তে
আমার উগ্র পরশে জ্বলে হউক ছাড়খার।
প্রভাতী আলোর মিষ্টি আবেশে
তুমি সুখ প্রদীপ জ্বালিয়ে এসো।

নতুন ওনতুন শুনছো আমার সব কথা?
অভাব আর ক্ষুধার পৃথিবীতে
তুমি নিয়ে এসো লক্ষ্মীর ভান্ডার,দুমুঠো ভাতের জোগানে দুখী মনে নেমে আসুক সুখ জোয়ার। 

হিংসা বিদ্বেষ যত ডুবিয়ে দাও ঐ দূরের সাগরে
অগ্নিস্নানে স্নাত হয়ে ফিরুক তোমার কোলে
ভালোবাসার বার্তা নিয়ে প্রেম সুবাস মেখে,
চক্রান্তকারীর মুখোশ খুলে উদার মনটি টেনে এনো সমুখে।

নতুন, ও নতুন, আমার কথা শুনে
একবার এসো ফেরিওয়ালা সেজে
স্বপ্ন ভঙ্গের দুঃখ ভুলিয়ে নতুন স্বপ্নের করো বেচাকেনা 
শুধু ভালোবাসা আর মঙ্গলধ্বজার দরে।

পৃথিবী আবার শান্ত হোক,প্রকৃতি হোক মনোহারী
নতুন আলোর নতুন রঙ্গে হোক রঙ্গীন।
আমি শেষ চৈত্রের পড়ন্ত সূর্য
নতুন,ওনতুন একটিবার শুনো আমার আহ্বান।

আগামী সংস্কৃতির সম্ভাবনা


✒️রেহানা বেগম হেনা

হে ঘুমন্ত নারী তোমরা 
তোমরা আড়মোড়া ভেঙে
নবাগত সূর্যে দু'পাতা মেলো,
ফেলে আসা ক্যানভাসে তাকাও অতীতের পানে।

পৃথিবীর পুণ্য জন্ম লগ্নে যেথা ছিলো উষ্ণতার পরশ 
উভয়ের একসাথে মেলবন্ধন, 
ছিলো না নরনারীর অমানবিক ভেদাভেদ,
সময়ের হাত ধরে ছিলো একসাথে পথচলা।
অজস্র বন্ধুর সময় ডিঙিয়ে 
মিলেমিশে একাকার উচ্ছ্বাসী ক্ষণে থাবা গেড়েছে শিকারী জীবন! 

অজানা দুর্বিপাকে
হঠাৎ ঘনিয়ে আসে ওরা আমারা'য়
        চরম বৈষম্যের কালোমেঘ!
কোন্ মস্তিষ্কপ্রসূত নারীত্বের সত্তা পিছনের সারিতে,
দুর্বলতার নামাবলীতে অসহায় অশুচির গণ্ডি?
যে নারীর পাল তোলা নৌকোয় 
বয়ে চলে পুরুষের সাথে মিলে সৃষ্টির ধারা,
কোন্ ছলনায় হল নারী একা গতিহারা ?

জ্ঞানী গুণী পুরুষ হয়তো বলে 
নারী অবলা, দুর্বল! 
কোন্ অভিধানে কোথা সে তেমন?
সমাজ উত্তরণে জল স্থল অন্তরীক্ষে নারী আজ সমান বেগে।
সৃষ্টির ধারক লম্বা বিনুনিরা আজ প্রাসঙ্গিক সমালোচনায় অজস্র পথে প্রান্তরে অবিচল শীর্ষে,
নানান অবতারণায় কঠিনতম দৃশ্যে।
সব খোয়ানো বিচিত্রিতায় জেগে ওঠা অদম্য সম্ভাবনা, 
পার্থিব জগতে বহু কৃষ্টি মাঝে আগামী সংস্কৃতির উদ্ভাবনা।

ডাক

✒️ চন্দন পাল 

এখন আমরা সব ভদ্দর হয়ে গেছি।
উঁচু দেয়াল আর মুঠোফোনের দেয়ালে আটকে
শুনতে ভুলে গেছি সেই দাঁত কিড়মিড়ি গলা ফাটানো ডাক।  
মা ঝাঁড়ু শেষ করে কিংবা বাবা লাকড়ির বোঝা নামিয়ে ডাকতো,,,
"সঞ্জয়, ও সঞ্জু, সইঞ্জা, "
কিংবা ও বাড়ি থেকে 
"দুগ্গিইইই,,, ও ভুতুনি, ও বাদাইম্মা-বাদাম্নী,,,
কই গেলি, দুপুরে চারটা গিলে বেরুলি, আর বাড়ি ফিরে আসার নাম নেই!"

দেখতাম সে ডাক ভেসে যেতো
হাস মুরগী খোয়ারের উপর দিয়ে
গোয়ালঘরের ভিতর দিয়ে
ডানে, পানাপুকুরে ঢেউ তুলে
খেজুর গাছে ধাক্কা খেয়ে
বাঁদিকে, রাঙ্গামাটির বাক্ ধরে 
আমবাগানের নীচ দিয়ে
তুলসী পিদিমের শিখা কাঁপিয়ে 
দূরের কোন মাড ওয়ালের সংসারে, কিংবা
দক্ষিণের কোন মাথানোয়া ছনের চালায়
কিংবা পুবের কোন ঝুলকালির রসি ঘরে। 

কী এক ভীষণ দরকার লুকিয়ে থাকতো, ঐ ডাকে।
কখনো পড়া, কখনো এক ছটাক তেল, কখনো একটু জর্দা, কখনোবা ও বাড়ির পঞ্জিকাটা,
কখনো পাড়ার ঢিলাঢিলির বিচার,
কখনো অনেকক্ষণ না দেখার কষ্ট । 

ডায়ে, বাঁয়ে কিংবা পেছনের এক ফালং দূরে, 
মাড ওয়াল, চৌচালা, আমবাগান রা শুনতো,
খবর হয়ে যেতো,
ভুতু রা এখনো বাড়ি ফিরেনি, ফিরেনি !
যে-ই আগে দেখতো, বলতো "ও সঞ্জয়, ও দুর্গা,,  
যা যা তাড়াতাড়ি বাড়ি যা, নয়ত আজ,,,,
নয়ত আজ পিঠের ছাল উ ঠ বে।"

মেয়েদের শশুড়বাড়ি

 ✒️যুস্মিতা দাশগুপ্ত

অনেক স্বপ্ন নিয়ে
      এসেছিলাম তোমার ঘরে,
বাঁধবো আমি সুখের সংসার
       সবাই কে আপন করে।

স্বপ্ন তো সেই স্বপ্নই রইলো
      হলো না আর পূরণ,
শশুড়-শাশুড়ি বলে খারাপ আমি
       ভালো না চলা ফেরার ধরন।

বাপের বাড়ির রাজকন্যা 
      শশুড়বাড়ির ঝি!
এটাই আমার নিয়তি 
      করবোই বা কি?

স্বপ্নভঙ্গ

 ✒️প্রতীক হালদার 

আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন গুলো 
থমকে গেছে হঠাৎ করে,
মনটা কেমন আনমনা আজ 
অচিন কোনো দমকা ঝড়ে!

দুঃখ গুলো হঠাৎ এসে 
বাঁধছে বাসা মনের ঘরে,
পাল্টে যাওয়া জীবনটাতে
রঙ গুলো সব যাচ্ছে সরে!

 নিঃস্ব মনে দুঃখ সাথি
একঘেঁয়েমির ধারাপাতে,
অতীতগুলো যন্ত্রণা দেয় 
ঘুমভাঙা কোনো গভীর রাতে!

চোখের কোণে বর্ষা নামে 
বৃষ্টি ঝরে অবিরত,
দিচ্ছে ছ্যাঁকা বারে বারে 
জমানো সব পুরানো ক্ষত!

ভাবনাগুলো পাল্টে গেছে 
দাবানলে পুড়েছে মন,
মুখের হাসি হারিয়ে গেছে 
দুঃখের ছাপ সর্বক্ষন!

উঠুক জেগে একটা আকাশ


                     ✒️গোপা রায়

চোখের ভিতর একটা আকাশ, চোখের ভিতর মনের ভিতর--
 নীল গলে সে সমুদ্র ছোঁয়--
সমুদ্র ছোঁয় ঢেউয়ের পরে ঢেউ জড়িয়ে শেষ সীমানায়,
শেষ সীমানায় সূর্য উঠে সূর্য ডোবে-- পালের পরে পাল চলে যায় --
চোখের ভিতর মনের ভিতর।
একটা পাখি উড়বে বলে পালক ডানায় ইচ্ছে জানায়--
 পাহাড় ছুঁয়ে দূরের দেশে দুঃখবিহীন সে অক্লেশে উড়ছে শুধু আকাশ জুড়ে নদী ছুঁয়ে মেঘের ভিড়ে--
চোখের ভিতর মনের ভিতর --
বিন্দু থেকে সিন্ধু হয়ে উঠুক জেগে একটা আকাশ--
চোখের ভিতর মনের ভিতর।।
        

স্বপ্নালাপ


    ✒️    অভিজিৎ চক্রবর্ত্তী

একছড়ি গান তোমার ছোঁয়ায় স্রোতের মোহনায়। 
ঢেউয়ে ঢেউয়ে নীলসাগরে প্রেমের নৌকা বায়।। 
মন হারানোর অচিন ভোরে তোমায় খোঁজে যায়। 
কত না রঙিন স্বপ্ন শৌখিন মিশে কল্পনায়।। 
তুমি হীনা, দিন কাটে না, রাত্রির জোছনায়। 
জানো কি তুমি, খোঁজি কি আমি, চাঁদের ইশারায়।। 
তুমি যে আমার ঘুমের পরী মনের আঙিনায়। 
তুমি বিনা হায়, শূন্য আমি ভরপুর দুনিয়ায়।। 
সন্ধ্যা তারার আলো তুমি চাঁদের জোছনা। 
 আঁধার রাতে তোমার রূপের হয় না তুলনা।। 
মিঠে মিঠে আলো তোমার শান্ত ওই বাতায়নে। 
দেখে পাই সুখ চাঁদপানা মুখ মুগ্ধ দু-নয়নে।।

ভোরার আকাশ

 ✒️ দ্বীপ বণিক 

হালকা রোদ উঁকি মেরেছে,
    তাল পাতার ফাঁকে,, 
কাক কোকিল গান ধরেছে,
    শিমুল পলাশের ডালে,, 
নদীর বুকে ঢেউ উঠেছে, 
    বাতাসের সুরে ছন্দে,,
মাঝি জেলে নৌকা চেপে, 
   নদীর বুকে ভাসে,,
গাছ গুলো সব ছুঁতে চাইছে, 
    সূর্যের রশ্মি কনা,,
বাতাসের তালে মাথা নাড়িয়ে,
    নিত্য করে সারা বেলা,,
আবার হঠাৎ বৃষ্টির মাঝে, 
   সূর্য লুকিয়ে গেল,,
কালো মেঘে আকাশ খানি, 
    ধূসর হয়ে গেল,,

মিথ


     ✒️অসীম দেববর্মা 
                    
প্রতিরাত একটি কথাই বলে যায়
 আজকের দিনের জীবন মুহুর্তে
             তোমার জয়,
 আগামী ভোরে আবার যেনো
                দেখা হয়।
অস্তমিত আলোয় যা কিছু প্রাপ্তি
               কালকের 
উদিতো আলোয় তা কিন্ত হতেও
           পারে অন্যের!

অটুট বন্ধন ‌

✒️সঙ্গীতা গুপ্ত

অলস দুপুরে অল্প অল্প হাওয়া বয়ে যাচ্ছে,
ধরণী কে শীতল করার আগাম বার্তা দিচ্ছে,
আনমনা ছিলাম,
হাওয়ার দাপটে সম্বিত ফিরে পেলাম,
সমস্ত আকাশ জুড়ে মেঘেদের ছোটাছুটি,
মনে হয় কোন মহোৎসবে যাবার প্রস্তুতি।
গুরু গুরু গর্জন আর বিদ্যুতের আলোর ঝলকানি তে,
বুকের ভেতর কেমন অজানা আশঙ্কা জাগছে,
হঠাৎ দেখি মেঘের গা থেকে বৃষ্টির দানা ঝড়ছে,
ঝড় বিদ্যুৎ নিয়ে পৃথিবীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
জমাট মত ধুলোবালি , ধুয়ে গেল জলের তোড়ে।
আকাশ যেন কেমন খালি খালি,
অভিমানী আকাশ নিশ্চুপ,
বৃষ্টির দানার সাথে,
মাটির সম্পর্কের বন্ধন থাকুক অটুট।

আমাদের শচীনকর্তা



✒️জহরলাল দাস

বাঁশি শুনে আর কাজ নাই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি ", " কে যাসরে ভাটি গাঙ বাইয়া, আমি টাকডুম টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল, "আমি সব ভুলে যাই, তাও ভুলি না বাংলা মায়ের কোল "--- উপরোক্ত গানের পঙক্তি গুলো উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে শ্রোতা সাধরনের মানসপটে যে ছবি ভেসে ওঠে, তাকে নতুন করে পরিচিতি দেওয়ার তেমন প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভারত উপমহাদেশ তথা বাংলা মায়ের এই সুসন্তান কিংবদন্তি সঙ্গীত শিল্পী আমাদের প্রিয় সুরসম্রাট শিল্পী শচীন দেববর্মণ বা শচীন কর্তা আমাদের ত্রিপুরার এক গর্বের নাম।গোটা দেশের সঙ্গীত প্রিয় মানুষকে তিনি মুগ্ধ করেছিলেন তাঁর সুরের মূর্চ্ছনায়। সারা দেশে এস.ডি. বর্মণ নামে নামে খ্যাত হলেও ত্রিপুরায় তিনি সকলের প্রিয় শচীন কর্তা। কারন এই দেশবরেন্য শিল্পী আমাদের ত্রিপুরার ভূমিপুত্র।তৎকালীন রাজন্য শাসিত বৃহত্তর ত্রিপুরার কুমিল্লা শিল্পীর জন্মস্থান। ত্রিপুরা মানিক্য রাজবংশের রাজা ঈশান চন্দ্র মানিক্যের দ্বিতীয় পুত্র নবদ্বীপ চন্দ্র দেববর্মণ ছিলেন শচীন দেববর্মণের পিতা।কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে শচীন দেববর্মণের পিতা নবদ্বীপ চন্দ্র দেববর্মণ রাজ সিংহাসনে আরোহণ করতে পারেন নি। যারফলে নবদ্বীপ চন্দ্র দেববর্মণ রাজধানী আগরতলা ছেড়ে 1281 ত্রিপুরাব্দের আষাঢ় মাসে কুমিল্লায় গিয়ে বসবাস করতে থাকেন। 1906 সালের 1লা অক্টোবর বৃহত্তর ত্রিপুরার এই কুমিল্লাতেই শচীন দেববর্মণ জন্মগ্রহণ করেন। কুমিল্লার এক সাংস্কৃতিক পরিবেশ পরিমণ্ডলে শচীন দেববর্মণ বড় হয়ে উঠেন। কারন শচীন দেববর্মণের পিতা নবদ্বীপ চন্দ্র দেববর্মণ নিজেই ছিলেন একজন ধ্রুপদী সঙ্গীতের দক্ষ শিল্পী।চিত্রাঙ্কন ও ভাস্কর্যের প্রতি ও ছিল তাঁর পিতার প্রবল আকর্ষণ। স্বভাবতই জন্মসূত্র এবং প্রকৃতিদত্তভাবেই এসব সদ্গুনের প্রভাব ছেলে শচীন দেববর্মণের উপর পরেছিল।
তাছাড়া কুমিল্লায় তাঁদের বাড়িতে বড় বড় জ্ঞানীগুনী শিল্পীদের আনাগোনা ছোটবেলা থেকেই শচীন দেববর্মণ প্রত্যক্ষ করতেন। অনেকটা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির মত। যার প্রভাব পরবতীর্তে রবীন্দ্রনাথের উপর পড়েছিল। যাইহোক এই কুমিল্লাতেই শচীন দেববর্মণের শৈশব, কৈশোর, যৌবনের দিনগুলো কেটেছিল। কুমিল্লার চোরথায় ছিল তাঁদের বড় বাড়ি। "আম- জাম-কাঁঠালের ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়"- এই কুমিল্লা-ই শচীন দেববর্মণের জীবনের ভিত্তিভূমি। 1920 খ্রিস্টাব্দে শচীন দেববর্মণ জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে আই এ ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু স্কুলের লেখাপড়ার চাইতে গানবাজনার প্রতি তাঁর মন নিবদ্ধ থাকত। খেলাধুলার প্রতি ও ছিল প্রবল আগ্রহ। 
শচীন দেববর্মণের পিতা নবদ্বীপ চন্দ্র দেববর্মণ চেয়েছিলেন শচীনকে বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে আনবেন কিন্তু সঙ্গীতে যার মন আবদ্ধ তাকে কি করে ফিরানো যায়? শচীন দেববর্মণ রাজপরিবারের সমস্ত কৌলিন্য, আভিজাত্য ইত্যাদিকে তোয়াক্কা না করে গানের এক পাগল নেশায় কুমিল্লা জনপদের আউল বাউল ফকির মুর্শিদ সহ আমজনতার সাথে ও মিশে যেতেন নিরদিধায়। এ ব্যাপারে বাড়ির বড়দের আদেশ নির্দেশ ও তিনি মানতেন না। 
এ বিষয়ে তাঁর নিজস্ব কৈফিয়তটি উল্লেখ করা যেতে পারে---" রাজবাড়ির নিয়ম অনুযায়ী জনসাধারণ থেকে আমাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে গুরুজনেরা আমাদের শৈশব থেকেই সচেতন করে দিতেন। তাঁরা তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতেন যাতে আমরা সাধরন লোকের সাথে মেলামেশা না করি। আমি তাঁদের এ আদেশ কোনওদিন ও মেনে চলতে পারি নি। কেন জানি না জ্ঞান হবার সঙ্গে সঙ্গেই মাটির টান অনুভব করে মাটির কোলেই থাকতেই ভালবাসতাম। আর বড়ো আপন লাগত সেই সহজ সরল মাটির মানুষগুলোকে।"
কুমিল্লা অঞ্চল তখন থেকেই একটি বর্ধিষ্ণু এলাকা হিসেবে পরিচিত। শচীন দেববর্মণদের বাড়িতে তখন থেকেই অনেক জ্ঞানীগুনী শিল্পী সাহিত্যিকদের আড্ডাস্হল। 
পল্লীবাংলার সেরা গায়কেরা এখানে এসে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। শচীন দেববর্মণ তখন থেকেই এদের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হন। উচ্চশিক্ষার জন্য পিতা অনেক চেষ্টা করা সত্বেও ছেলে শচী দেববর্মণের সঙ্গীত নেশার কাছে হার মানেন।1925 সালে বিখ্যাত গায়ক কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে গান শিখতে শুরু করেন। ওস্তাদ ভীষ্মদেবের কাজে ও তিনি গান শেখেন। তখন থেকেই সঙ্গীতই হলো শচীন দেববর্মণের ধ্যান জ্ঞান। 
কুমিল্লার বাড়ীতে থাকাকালীন সময়েই নজরুল ইসলাম ও শচীন দেববর্মণদের বাড়িতে আসতেন এবং শচীন দেববর্মণের সাথে গান গাইতেন। আগরতলা- কলকাতা- কুমিল্লা গানের টানে ছুটে বেড়াতেন শচীন দেববর্মন।
তবে শচীন দেববর্মণের প্রানের গান হলো--" লোকগান বা পল্লীগান। 
আগেই বলেছি কুমিল্লার পল্লীবাংলার প্রকৃতি হাট- মাঠ- বাট- নদী- নালা, আকাশ- বাতাস শৈশব থেকেই শচীন দেববর্মণের উপর প্রভাব ফেলেছিল। সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ছিল বালক শচীনের কাছে পর্বত-দুহিতা চপলা গোমতী নদী। এই নদীর তীরে ছুটে যেতেন, বসে বসে বাজাতেন বাঁশের বাঁশি। আর নৌকার মাঝির ভাটিয়ালি গান শুনে তাঁর মন উদাস হয়ে যেত। এই পরিবেশ তাঁকে ভাবুক হতে সাহায্য করেছিল।
বৃহত্তর ত্রিপুরার বঙ্গসংস্কৃতি প্রভাবিত কুমিল্লাতে হাটে-মাঠে-বাটে তখন থেকেই মাঝি- মাল্লা, আউল- বাউল ফকির মুর্শিদের গানের সুর ভেসে বেড়াতো আকাশে বাতাসে। শৈশব থেকেই শচীনের রক্তে মজ্জায় এগুলো মাখামাখি হয়েছে।পরবর্তী সময়ে তাঁর কন্ঠে আমরা শুনতে পাই " কে যাসরে ভাটি গাঙ বাইয়া, আমার ভাই ধনরে কইও নাইয়র নিত আইয়্যা "। নববধূর আকুতি মেশানো এই গানখানি।
তাছাড়া কুমিল্লার বাড়ীতেই ছোটবেলা থেকেই শচীন তাঁর বাবা এবং তাঁদের বাড়িতে আনোয়ার এবং মাধব নামে দু'জন কাজের লোকের কাছে সঙ্গীত শিক্ষার তালিম নিতেন।
মাধব ও আনোয়ার সন্ধ্যা বেলা ভাটিয়ালি গান করতেন যে গানের ভক্ত ছিলেন শচীন। 
1906 সাল থেকে 1924 এই আঠার ঊনিশ বছর শচীনকর্তার কুমিল্লায় কেটেছে লেখাপড়া, খেলাধুলা আর গানের সংমিশ্রণে। 
1924 সাল থেকে শচীন কর্তার কলকাতার জীবন শুরু হল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি নিয়ে এম.এ.পড়তে ভর্তি হলেন। কিন্তু রক্তে যার গানের নেশা তাঁর কি পড়াতে মন বসে? একবছর পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ায় ইতি দিয়ে 1925 সালে গায়ক কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে গান শিখতে শুরু করেন। তাঁর বাবা ছেলের এই খেয়ালীপনায় যদিও মনক্ষুন্ন হন কিন্তু তাঁর এই সঙ্গীত নেশা আটকানো সম্ভব হয় নি। বাবা নবদ্বীপ চন্দ্র চেয়েছিলেন শচীনকে বিলেতে পাঠিয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে আনবেন কিন্তু বাবার ইচ্ছে আর বাস্তবায়িত হল না।
কলকাতায় থেকে ও শচীনের মন পরে থাকত তাঁর সাধের প্রিয় জন্মভূমি কুমিল্লায়। সঙ্গীতের দুনির্বার নেশায় তিনি গায়ক কৃষ্ণচন্দ্রকে নিয়ে আসতেন কুমিল্লায় কখনো আগরতলায়।
কুমিল্লা বা আগরতলা গেলেই শচীন কর্তা গানের খোঁজে গ্রামে চলে যেতেন। নতুন নতুন গান তুলে আনতেন। নবদ্বীপ কর্তার আগরতলা বাড়ির বৈঠকখানায় গানের আসর বসাতেন। ফকির বৈষ্ণবদের ডেকে আনতেন। এসব কাজে তাঁর কোন কুন্ঠা ছিল না। পরবর্তীসময় নিজের আত্মজীবনীতে তিনি নিজেই লিখেছেন--" পূর্ববঙ্গের ওই অঞ্চলের এমন কোন গ্রাম নেই বা এমন কোন নদী নেই, যেখানে আমি না ঘুরেছি।ছুটি ও পড়াশোনার ফাঁকে আমি গান সংগ্রহ করতাম। আমার এখনকার যা কিছু সংগ্রহ যা কিছু পুঁজি সে সবই ওই সময়কার সংগ্রহেরই সম্পদ। আজ আমি শুধু ঐ একটি সম্পদেই সমৃদ্ধ, সে সম্পদের আস্বাদন করে আমার মনপ্রাণ আজ ও ভরে ওঠে। যে সম্পদের জোরে আমি সুরের সেবা করে চলছি--- তার আদি হল আমার ওইসব দিনের সংগ্রহ ও স্মৃতি। "
আগরতলার নিজস্ব " শকুন্তলা রোডের পৈতৃক বাড়িতে ( বর্তমানে যেখানে রবীন্দ্রভবন) গানের মজলিসে তাঁর সঙ্গীত পিয়াসী মন সঙ্গীতের সুধারসে সিক্ত করতেন শচীন। আগরতলায় দুর্গাবাড়ির দিঘির ( কৃষ্ণসাগর) পাড়ে বসে গভীর রাতে আনমনে পল্লীগানের সুরের মায়াজাল বিস্তার করে চলতেন। এইভাবে চলত শচীনের সঙ্গীতের সুরকে করায়ত্ত করার সাধনা।
1925 থেকে 1930 -- এই ছ' বছর শচীন কর্তা কলকাতায় কৃষ্ণচন্দ্র দে, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, শ্যামলাল ক্ষেত্রী ও বদল খাঁ-র কাছে তালিম নিয়েছেন । শচীন দেববর্মণ প্রথম দিকে 1923 খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। কলকাতায় তখনও তেমন নাম ডাক হয় নি। কলকাতায় " মহানির্বান রোডে"ওর বাড়িটির নাম ছিল " সুরলোক"। প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, হিমাংশু দত্ত, সুধীর চক্রবর্তী অজয় ভট্টাচার্য প্রমুখদের ছিল নিয়মিত আড্ডা। ওখানে সঙ্গীত নিয়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা, আলোচনা, গবেষণা করতেন ওঁরা। 
কলকাতায় তিনি প্রথম গানের রেকর্ড করেন---"ডাকলে কোকিল রোজবিহানে।"(1মপীঠ)
2য় পীঠে--"এই পথে এসো প্রিয়"।
শচীন কর্তা ছিলেন রাগপ্রধান, ধ্রুপদী, পল্লীগীতি ও ভাটিয়ালি গানের পরিবেশনের যথার্থ দূত-শিল্পী।ত্রিপুরাকে তিনি বহির্বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন। 
এরপর থেকে আর পিছু ফিরে তাকান নি তিনি। এই কালজয়ী কিন্নরের কন্ঠে গীত হয়ে একের পর এক রেকর্ড বেরুতে লাগল। 
ও কালো মেঘ বলতে পারো/ আমি জল ফেলে জল ভরি/ তুমি নি আমার বন্ধুরে/ গৌর রূপ দেখিয়া হয়েছি পাগল/নিশীথে যাইও ফুলবনে ভ্রমরা/ শ্যামরূপ ধরিয়া/ এসেছে মরন/ কালসাগরের মরন দোলায়/ বিদেশিরে উদাসীরে ফিরে তুমি যাও/ধিক ধিক আমার এ জীবনে/ মন দুঃখ মরিরে সুবলসখা/ ব্রজের কিশোরী রাধা বিনে/ মালা খানা ছিল হাতে/মেখলা নিশি ভোরে মন যে কেমন করে/পদ্মার ঢেউরে মোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা যারে/আজো নয় প্রিয় আজো/ প্রেম যমুনার পাড়ে/প্রেমের সমাধি তীরে/ ঝন ঝন মঞ্জিরা/ওরে সুজন নাইয়া চাঁদের ডিঙি বাইয়া/বন্দর ছাড়ো যাত্রীরা সব জোয়ার এসেছে আজ/আমি ছিনু একা বাসর জাগায়ে/ মধু বৃন্দাবনে দোলে রাধা/ কথা কও দাও সাড়া/ রঙীলা রঙীলারে আমারে ছাড়িয়া বন্ধু কই গেলারে/ এ পথে এসো না প্রিয়ে/ কহু কহু কোয়েলিয়া ইত্যাদি সব কালজয়ী ভাটিয়ালি, কীর্তন, আধুনিক, রাগপ্রধান, পল্লীগীতি, ঝুমুর, নজরুল সঙ্গীত প্রভৃতি শতাধিক রেকর্ড।
শচীন কর্তার কর্মময় জীবনকে আমরা তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি। (1906---1924)--শৈশব ও কৈশোর কুমিল্লায় , দ্বিতীয় অধ্যায়ে (1925--1940)--- কলকাতার কর্মময় জীবন, তৃতীয় অধ্যায়(1944--1975) মুম্বই- এর জীবন। এখানেই চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়। সঙ্গীতজ্ঞ ও সঙ্গীত নির্দেশক হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি এই সময়টাতেই।
শচীন দেববর্মণ মোট 131টি বাংলা গান গেয়েছেন। 127টি একক গান। বাকী 4 টি স্ত্রী মীরা দেববর্মনের সঙ্গে দ্বৈত কন্ঠে গেয়েছেন। 114টি গানে শচীন কর্তা শিল্পী ও সুরকার। বন্ধু অজয় ভট্টাচার্যের লেখা মোট 140টি বাংলা গান তিনি গেয়েছেন। যাঁর লেখা বাংলা গান শচীন কর্তা সবচেয়ে বেশি গেয়েছিলেন তিনি বন্ধু অজয় ভট্টাচার্য।
1943 সালে তাঁর জীবনের শেষ বছরে তিনি দুটি ছবি পরিচালনা করেন। একটি ছবি 1943 সালে ও দ্বিতীয় ছবিটি 1944 সালে মুক্তি লাভ করেছে। 1943 সালের ছবির নাম "ছদ্মবেশি" এবং 1944 সালের ছবির নাম "অশোক"।
এই দুই ছবিতেই সুর দিয়েছেন শচীন দেববর্মণ।1944 সালে শচীন দেববর্মণ "ছদ্মবেশি" ছবিতে সুর সংযোজনার জন্য শ্রেষ্ঠ সুরকারের পুরস্কার পান।
"আরাধনা"ছবি প্রথম তাঁকে রাষ্ট্রীয় সন্মানের সুযোগ এনে দেয়। তিনি পদ্মশ্রী খেতাব লাভ করেন এ ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করে। এরপর অসংখ্য ছায়া ছবিতে সুর দিয়েছেন, সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন তিনি।1964 সালে "ক্যায়সে কঁহু" ছবিটিতে সুরসৃষ্টির জন্য সুরসৃঙার সংসদ কর্তৃক সন্ত হরিদাস পুরস্কার পান। এর পূর্বে 1959 খ্রীষ্টাব্দে লন্ডনে এশিয়াড ফিল্ম সোসাইটি " পিয়াসা" ছবিতে সুরারোপ করার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পুরস্কার পান। "ফিল্ম ফেয়ার " পুরস্কার পেয়েছেন দু' বার 1953 ও 1974। 1958 সালে সঙ্গীত নাটক একাডেমীতে পুরস্কৃত হন।1962 সালে ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে সঙ্গীত প্রতিযোগীতার অন্যতম জুরি হিসেবে মনোনীত হন। 
প্রসঙ্গত এইসব পুরস্কার খ্যাতি তিনি 1944 সালের পর স্ত্রী মীরা দেববর্মন ও পুত্র রাহুলকে নিয়ে সপরিবারে মুম্বইতে আসার পর বৃহত্তর সঙ্গীত জীবনে প্রবেশের পর পেয়েছিলেন। এতক্ষণ যতটুকু বললাম তা হলো শিল্পীর বিশাল কর্মময় জীবনের এক ক্ষুদ্র খন্ডাংশ।শিল্পীর বহুবর্ণময় জীবনের আরো অনেক কিছুই বাকী রয়ে গেছে। সারাদিন লিখেও শেষ করা যাবে না। যাইহোক মুম্বই- এর মত চাকচিক্যময় অভিজাত শহরে খ্যাতি ও সন্মানের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে ও তিনি নিজ মাতৃভূমি কিংবা জন্মভূমি আপন শিকড়ের কথা ভুলতেন না। সময় সুযোগ পেলেই চলে আসতেন কুমিল্লা, আগরতলায় মা- মাটি- মানুষের টানে। এখানেই শিল্পীর বিশেষত্ব, মহত্ত্ব। যা শিল্পীকে মানুষের গোপন হৃদয়ের অন্তস্তলে ভালবাসার চিরবেদী স্থাপন করে দিয়েছে। 1975 সালে 31অক্টোবর গন মানুষের প্রিয় শিল্পী বাংলা মায়ের কোল ছেড়ে অমর ধামের কোলে চলে গেলেন। রেখে গেলেন মেঠো সুরের রূপ ও গন্ধ।

স্মৃতি

  ✒️বিউটি শুক্ল দাস
   
পাখির রবে ঘুম ভাঙ্গে 
শিশির ভেজা পায়ে,
লাঙ্গল কাঁধে চাষিভাইরা
মাঠের পাশে ছুটে।

নদীর পানে জোয়ার-ভাটা
হৃদয়ে তুলে দোলা,
আকাশ আজি হাত বারিয়ে
শৈশবকে ডাকে।

শিশুর ঠোঁটের মিষ্টি হাসি
প্রাণে জাগায় পুরোনো স্মৃতি,
সময়ের টানে বাঁধা পরে
ভুলতে বসেছি সেই পুরোনো দিনটি।

মায়ের চোখে লুকিয়ে
দুপুর রোদে খেলতে যাওয়া,
সন্ধ্যা হলেই বই নিয়ে
না পড়ার বায়না ধরা।

বন্ধুদের সাথে হৈ চুঁই
এখন আর পাব কই,
সবকিছু যেন হয়ে গেছে
এখন স্মৃতির গোচর।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ


 
✒️সোমা নস্কর 

বাংলা ভাষার সেরা রবি
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি!
কবিতা লেখায় সিদ্ধহস্ত 
কলমই তাঁর প্রধান অস্ত্র,
ছোটগল্পে স্বার্থক প্রাণ 
বাংলাভাষার দিলেন মান 
উপন্যাস ও লেখেন তিনি
বালক বৃদ্ধ সবাই চিনি।

বঙ্গমাতা ধন্য আজ 
দেশের জন্য ও করেন কাজ
কবিগুরুর প্রধান গুণ 
বঙ্গ সাহিত্যেও ছিলেন নিপুণ, নাটক কাব্যে পাই পরিচয়
অশিক্ষার অজ্ঞতা ঘোচান অপচয়
অর্জন করেন বহু প্রতিভা
বাংলা ভাষার উজ্জ্বল প্রভা।

বাঙালী যার গর্ব করেন
ধন্য বঙ্গমাতা তারে গর্ভে ধরেন
তাঁর নাম কীর্তি অক্ষয় রবে
রবীন্দ্র জয়ন্তী আসবে কবে?
বাংলা ভাষার সেরা রবি
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি!

অশনি সঙ্কেত


  ✒️সুখময় মুড়াসিং

 পরমানন্দ স্বীকৃত কর্মচারী সংগঠনের রাজ্যস্তরের নেতা।সংগঠনের কাজই তার ধ্যান জ্ঞান একাজে বিন্দুমাত্র অবহেলা তার কাছে হারাম । অনেকেই তাকে যেমন তাত্বিক বলে থাকেন তেমনি আড়ালে গোঁয়ার ও বলেন।তিনি অনেকের যেমন প্রিয় তেমনি অনেকের চক্ষুশূল । নির্বাচনের এক বছর আগে স্বউদ্যোগে রাজ্য চষে রাজ্য নেতৃত্বের কাছে রিপোর্ট জমা করে বলেছিল -- "পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে সময় থাকতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক" । মুষ্টিমেয় নেতা ইতিবাচক হলেও সিংহভাগ নেতাই ফুৎকারে উড়িয়ে বলেছিল -- "হাতিকে চামচিকার ভয় দেখানো"। তার আশঙ্খা ই সঠিক হল, নির্বাচনে ভরাডুবির পর সব নেতা কর্মীরাই বাড়ী ছাড়া হল তিনিও বদলির অপেক্ষায় রইলেন।                      
   "কয়লা ধুলেও ময়লা যায়না," নতুন জায়গায় সংগঠনের নাম না করে নিজের মত করে আড়ালে কাজ চালিয়ে যাতে লাগলেন। স্ত্রী নিয়মিত ফোন করে দিনে কয়েকবার খুঁজ খবর নিত, নানা পরামর্শ দিত তিনিও নিয়মিত মাসে দু'বার বাড়িতে আসতেন।অশনি সংকেতের কালো মেঘ ধীরে ধীরে জমতে লাগল ! কয়েক মাস যেতে না যেতে স্ত্রী, সংসারের প্রতি উদাসীনতা ও অবহেলার অভিযোগ আনতে লাগল।পরমানন্দ হাজারো বুঝিয়েও ব্যর্থ হতে লাগল,স্ত্রীর একই কথা-- অন্যরাও পার্টি সংগঠন করে তাদের স্ট্যাটাস আর তোমার স্ট্যাটাস দেখ ? আকাশ পাতাল পার্থক্য। তাদের কাছাকাছি বদলি হল আর তোমার তিন জেলা পার করে রাজ্যের শেষ প্রান্তে , ওরা নতুন নেতাদের সঙ্গে দহরম মহরম করে চলছে আর তুমি ? পরমানন্দ বিস্মিত হলেও ঠান্ডা গলায় বুঝানোর চেষ্টা করে - কে কি করছে তা না ভেবে এস আমরা আমাদের মত থাকি,তাতে মঙ্গল হবে। স্ত্রী ঝংকার দিয়ে বলে - তোমার সঙ্গে সংসার করে কি পেলাম ,কি দিয়েছ ? সংসারের ঘানি টানতে টানতে ভাটির টান শুরু হল, আর তুমি গায়ে হওয়া লাগিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। চুপ থাকাই শ্রেয় তাই পরমানন্দ মুখে কুলুপ এঁটে পুরনো দিনগুলি'র কথা ভাবছে। স্ত্রী জানত রাজনীতি তার প্রাণ ধ্যান জ্ঞান,কিন্তু নানা ছলনা করে পার্টির কাছে মিথ্যা প্রেমের অভিযোগ করে বিয়ে করতে বাধ্য করে ছিল , তখন কথা দিয়েছিল তোমার কাজে আমি কোন দিন বাধা দেবনা। কথা রাখল কই! বিয়ের পর সংসার চলছেনা বলে চাকরি করতে চাপাচাপি শুরু করল, নিরুপ্তাপ দেখে নিজেই নেতাদের বাড়ী বাড়ী ঘুরে চাকুরী জোগাড় করে আনল। রাজনীতির ক্যরিয়ার নষ্ঠ হলেও মেনে নিয়েছিল, সংসারের সুখের জন্য আজ হঠাৎ......। "আমরা করব জয় নিচ্ছয়" এই আদর্শে দিন গুনতে লাগল কিন্তু বিনা মেঘে বজ্রপাত , নৈতিক অধ:পতনের অভিযোগে সংগঠন থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ ধরিয়ে দেওয়া হল। আধ: বা কোথায় হল আর পতন বা কি করে হল জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি তাই যা হবার তাই হল। আসনিমা মধ্য গগনে শনির চক্র শিয়রে, মহিলা কমিশনের নোটিশ! স্ত্রীর অভিযোগ মানসিক নির্যাতন আর সাংসারের প্রতি উদাসীনতা। অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বেকসুর খালাস,পরমানন্দ আবারও বলল - "এস আমরা আমাদের মত থাকি,তাতে মঙ্গল হবে"।

আপন ও পর


✒️বিপ্লব গোস্বামী

কথাবার্তায় সবাই আপন
আসল আপন ক'জনা,
আপন পর সে'জন চিনে
ঠেলায় পড়ে যে'জনা।

সুখের কালে সবাই আপন
আপন জনের নেই অভাব,
বিপদকালে প্রকাশ পায় ভাই
লুকিয়ে থাকা স্ব স্বভাব।

তত্ত্ব কথা যে'জন বলে
মুখের কথায় আপনজন,
দুঃসময়ে ঠিক বুঝা যায়
প্রকাশ পায় কে সুজন।

আপন যে'জন নীরব থাকে
বলে না সে আপন আপন,
বিপদকালে ঝাঁপিয়ে পড়ে
প্রমাণ করে সে আপন।

সত‍্যিকারের আপন যে'জন
বিপদে সঙ্গ ছাড়বে না,
দুঃসময়ে থাকবে সাথে
কখনো হার মানবে না।

অনুভুতি

✒️সুব্রত দও

সপ্ন তুমি জেগে উঠেছিলে
            রঙিন এই আকাশে !
একটু আভাসে মুক্ত বাতাসের সাথে
            মনকে দোলা দিয়ে !
 রঙ্গিন এই আকাশে হাতছানি দিয়ে 
     উঠেছিলো সাতরঙা ওই রঙধনু !
    সোনালী রোধে শান্ত বিকেলে...
পাখীদের একসুরে আনন্দের কলরব!
       শীতের সকালে শান্ত ভোরে _
          মুক্তো ঝরা ওই শিশির !
   ভোরের আলোয় রোদের ছোঁয়ায়..
        আজ আর নেই পাশে তুমি !
    শান্ত আজ পৃথিবী,মুক্ত বাতাস...
       এ যেন নিরবতারই আভাস !
হৃদয়ের আর্তনাদে ভরা নীড় হারা পাখির মতো .........
               শান্ত আজ মন !
   ঝড়ের আভাসে,গোধূলী বিকেলে
       যেন নীরব আজ এই পৃথিবী !
 আজ নেই কোন সপ্ন,নেই কোন আশা !
    রঙিন অনুভূতিতে বৃষ্টিঝরা দিনে....
           আজ নেই কোন আনন্দ !
  চোখের কোনে অশ্রু এসে আজ শুধু
      তারই আভাস দিয়ে যায় !
  হয়তো ফিরবে না আর কোনদিন
       থাকবে শুধু অনুভূতি জড়িয়ে !

আক্ষেপ

✒️সমীরন পাল 

ইচ্ছেগুলো আগের মত আর বেহিসেবি হতে চায়না। 
দিগন্তহীন প্রত্যাশা নিয়ে,
এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে;
আগের মত আশায় আর বুক বাঁধা হয়না। 
কৈশোরের ভয় মিশ্রিত নীরবতা,
অলীক কল্পনার জগতে ভেসে যাওয়া;
জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিকেলে
মাঠের পারে গুধুলির সূর্যাস্ত দেখা আর হয়না।
ইচ্ছেগুলো আগের মত আর বেহিসেবি হতে চায়না। 
পাশের পাড়ার সাথে ক্রিকেট ম্যাচ,
সমবেত চিৎকারে মাঠ কাপানো;
ছোট ছোট খুশিতে ছিল অনাবিল আনন্দ
ক্ষুদ্র আঘাতে আগের মত আর কান্না পায়না।
কল্পনায় কারো ছবি আঁকার ঝোঁক আর নেই,
বিবর্নতায় হারিয়েছে সাধের কাঙ্ক্ষিত রামধনু;
আবেগ প্রকাশ-সে কবেই হল অতীত 
ধরা হয়না কারো কাছে আর আবদার বায়না।
ইচ্ছেএগুলো আগের মত আর বেহিসেবি হতে চায়না।

শনিয়াদা

✒️বিপ্লব উরাং 

কেউ মনে নাই রাখেছে
তর কথা শনিয়াদা।
কত রাত, কতদিন কানধে
লাল ঝান্ডা লিয়ে হাটেছিস বাগানে,গেরাম,শহরে।

দিনপরতিদিন উপাস করে
লড়াকু মানুষের সঙ্গে গলা মিলাইছিস,-
বলেছিস, হামদের হক দিতে হবেক।
মজুরি বাড়ানের দাবিতে টানা
পন্দর দিন বাগান বনধ ছিল।

কে রাখেছে মনে?-নাই 
তেমন করে কেউ নাই রাখেছে। 
কন কাগজে,কলমে লিখা
নাই হয়েছে তর কাহানী। 

কেনে জানি তর কথা মনে
ভাসে উঠল আাইজ।
তর মুখে শোনা কিছু কথা-
নবীন কাকা(সাঁওতাল) সুকুমারীদি (পানিকা)র
মুখে শোনা,
তদের কত কাহানী ভাসে উঠছে চখে।

কতদিন বাগানের মানুষের দুখ্ কষ্টের লড়হাই-এর
কথা বলতে গেছিস নেতাদের খিনে আগরতলা বামুটিয়ায়
পায়ে হাটে কালাছড়ালে।

জানি নাই, নাই জানি।
তর মত কত মানুষের কত কাহানী অজানাই থাকে যাবেক।
কথাও লিখা নাইখে।

মনে পড়ছে তদের কথা বারে বার।

বাঁধনহারা

✒️প্রবীর পাঁন্ডে
        
দাও ভেঙে দাও পাষাণ আগার-
দাও খুলে দাও রূদ্ধ দুয়ার-
থাকব না আর বদ্ধ ঘরে, 
যাই চলে যাই অনেক দূরে। 
প্রেমের শিকল পায়ে দিয়ে
রেখো না আর কারায় পুরে;
মধুর কথায় আমায় ভূলে
হৃদয় খানি বন্দী করে। 
বাঁধনহারা পাখির মতো
যাই উড়ে যাই গগন তলে, 
শূন্যের সাথে মিলন হতে 
নীলাভ দুটি ডানা মেলে। 
রূপের মাঝে অরূপ হয়ে
যাই হারিয়ে মেঘের দেশে, 
স্বর্ণ প্রদীপ জ্বালিয়ে যেথা
মেঘের বালা রয়েছে বসে। 
সবল জোরে বুকের মাঝে
আকাশ টাকে আঁকড়ে ধরে
নন্দন বনে আসন পেতে
ঘুমিয়ে পড়ি দ্যু লোক পরে। 
আকাশ হতে নীলিমা ছেঁকে
নয়ন ভরে করিব পান;
ঝরনা স্রোতে সুর মিলিয়ে
খোলা দিগন্তে গাহিব গান।

একটি চশমা

✒️রূপঙ্কর পাল

.
দুটো কাঁচের টুকরো
ঝাঁপসা থেকে পরিষ্কার,
অন্ধকার হয়না তবে আলো
ভালো হতো, যদি হতো...

২.
সাদা-কালো-রঙিনের দুনিয়ায়
ইচ্ছে আর অনিচ্ছায় সাজিয়ে নেয়া–
ঠিক তখনই বস্তুখানি নিজের দুনিয়ায়
বড্ড আপন, পাল্টানো স্বভাব বহাল;

৩.
একটি চশমা সাথী হারা
হয় যখন, অনাদরে অবহেলায়
ঘরের কোণায় দিন যাপন,
কান্না কিন্তু সমাজ দেখেনা, নীরব;