....✍️ সুশান্ত ঘোষ
অজয়ের অবিশ্বাস আর ঋত্বিকার কাজ থেকে ফিরে আসার পর অশ্লীল সন্দিহান কথাগুলো দিনের পর দিন ঋত্বিকার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল । ঋত্বিকা অজয়ের কথাগুলো শুনতেই লজ্জাবোধ করত যে এই অজয়কে একদিন ও ভালবেসে পরিবারের অমতে একবারে জোর করে বিয়ে করেছিল। তাই একদিন রাগের মাথায় বলেই ফেলল, যখন এতটা খারাপ কথা বলে আমার অফিসের বস সীতাংশুর সাথে অহেতুক সন্দেহ করে ওই নোংরা কথাগুলো বলতে পারছো তাহলে ডিভোর্সের ব্যবস্থা করছ না কেন ? আমি সারাদিনের এই অফিসের ধকল, বাসে মেট্রোয় গাদাগাদি করে কষ্ট করে বাড়িতে ফিরে আসার পর, এই কথাগুলো আর সহ্য করতে পারছি না ।
অজয়ের কাছে সত্যিই এইরকম আচরণ একবারই প্রত্যাশিত নয় । বরাবরের শান্ত অজয় একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে টেকনিশিয়ানের কাজ করত । অনেক টাকা মাহিনা না পেলেও, ওর আর ঋত্বিকার কোম্পানির কেরানির চাকরি থেকে যতটুকু রোজগার করত, ওর ঋত্বিকা, অজয়ের বাবা মা ও ওদের একমাত্র ছোট্ট মিষ্টি চার বছরের মেয়ে ইপ্সিতার সুন্দর চলে যেত। আর অজয়ের বাবার পোস্ট অফিসের চাকরি থেকে রিটায়ার্ড করার পর যতটুকু পেনশনের টাকা পেতেন ।
কিন্তু বাধ সাধল এই অনুজীবের আক্রমণ আর অজয়ের কোম্পানির লকডাউন । প্রথমে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল । মালিক তিন মাসের বেতন দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিল, যে তার পক্ষে এইভাবে কর্মচারীদের বসিয়ে বেতন দেওয়া সম্ভব নয়, তাই যতদিন না অবস্থা স্বাভাবিক হচ্ছে, তিনি কোম্পানি বন্ধ রাখছেন। ফলে ওই সময় নতুন করে কাজ পাওয়ার কোন সুযোগ ও অজয়ের কাছে ছিল না । অজয় শুরুতে মানসিক ভাবে খুব ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু সেই সময় ঋত্বিকা আর অজয়ের বাবা বলেছিলেন, এতো চিন্তা করার কি আছে ? আমাদের যতটুকু রোজগার আছে, নুন ভাত ঠিক জুটে যাবে। কিন্তু এইভাবে বছর দেড়েক ঘরের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে অজয় যেন হাঁপিয়ে উঠেছিল। ওর আচরণ ভারী অদ্ভুত ভাবে, সমস্ত রাগ যেন ঋত্বিকার ওপর গিয়ে পড়ত । আর ঋত্বিকা সমস্ত দিনের শেষে যখনই বাড়িতে ফিরে আসত, তখনই অজয় ভারী অদ্ভুত ভাবে ঋত্বিকার সম্পর্কে এই কথাগুলো যেন অজান্তেই বলে ফেলত ।
অজয়ের এই অশান্তির কারণে ওর বাবা বলতেন, তোমাদের কাউকে কোন কাজ করতে হবে না। আমার যতটুকু পেনশনের টাকা পাই, তাতেই পাঁচজনের ঠিক চলে যাবে ।
কিন্তু ঋত্বিকা বলত, বাবা একে এই সময় কাজ পাওয়া মুশকিল, তার ওপর এইরকম হঠকারী সিদ্ধান্ত আপনার ছেলের পাগলামির জন্য, আমি মানতে পারছি না।
অজয় অবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলল ঋত্বিকাকে মিউচুয়াল ডিভোর্স দেওয়ার । ঋত্বিকা বলেছিল, তাতে যদি তোমার ভালো লাগে, আমাকে এইভাবে রোজ খারাপ কথা থেকে আমি মুক্তি চাইছি । আমি রাজি । উকিল কে ডেকে বিচারের ব্যবস্থা করল অজয় নিজেই ফোন করে ।
কিন্তু মিউচুয়াল ডিভোর্সের শুরুতেই অজয় বিচারকের সামনে বলল, আমার শুধুমাত্র একটাই সর্ত আছে যেটা মানতে হবে ঋত্বিকাকে । বিচারক বললেন, ওটাও আপনারা আলোচনা করে নিন নিজেরাই । অজয় বলল, না সবার সামনেই সর্তটা বলতে চাইছি, আমার সর্ত একটাই ডিভোর্সের পর ঋত্বিকা কিন্তু আমার কাছেই থাকবে । আমাকে ছেড়ে ঋত্বিকা কোথাও যেতে পারবে না ।
অজয়ের এই প্রস্তাব শুনে অবাক বিচারক, বললেন তাহলে ওনাকে ডিভোর্স দিতে চাইছেন কেন ?
অজয় বললো, ওর আচরণ আমার ভালো লাগছে না । তাই এই কঠিন সিদ্ধান্ত টা নিতে হলো । সন্ধ্যা ছটার সময় আগে ফিরে আসত অফিস থেকে বাড়িতে, এখন সাতটা- কোন কোন দিন সাড়ে সাতটা বেজে যাচ্ছে । আমাকে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে । এটা আমি সহ্য করতে পারছি না একদমই । আর ঋত্বিকার নিজের বাবা মা পরিবার, আমার মতো নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেকে ওর বিয়ে করার জন্য ওর সাথে কোন সম্পর্ক রাখেন না। ওদের বাড়ির অবস্থা খুব ভালো। আর সেখানে আমার পরিবারের কোন তুলনা ওদের সাথে চলে না । তাই বিয়ের পর থেকে ঋত্বিকা ওর পরিবারের সাথে কোন যোগাযোগ রাখে না ।
বিচারক বললেন, আপনাদের ব্যক্তিগত গাড়ি আছে ?
অজয় বললো না, সেইরকম অবস্থা আমাদের নেই । আর সেইরকম কোন ক্ষমতা ও নেই।
বিচারক বললেন, আপনি কি মনে করেন আপনার স্ত্রী কখনও, অপর কারো সঙ্গে, কোন রকম অবৈধ সম্পর্ক রাখতে পারেন ?
অজয় বললো, বিশ্বাস তো আমি করতে চাইছি না । কিন্তু দেরি করে ফিরে আসার জন্য এইরকম চিন্তা গুলো মাথায় স্বাভাবিক ভাবেই চলে আসছে ।
বিচারক বললেন, ঠিক বলেছেন আপনি । কিন্তু আজকাল যা অবস্থা গাড়ি ঠিকমতো রাস্তায় চলছে না । যে কটা চলছে ভীষণ কষ্ট করে, হয়তো আপনার স্ত্রী যাতায়াত করছেন । আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থা আজকে নেই তো । তারপর উনি একজন মহিলা ।
অজয় বললো এগুলো যেদিন ঘটে সেদিন তো এসে আগে বুঝিয়ে বলা হতো । এসেই সোজা বাথরুমে ঢুকে যায়, কোন কথা না বলে ।
বিচারক বললেন, ও এটা কারণ । ঠিক ভীষণ অন্যায় ঋত্বিকা দেবীর এটা । কিন্তু অজয় বাবু আপনাদের তো একটা মেয়ে আছে । আপনার বাবা মায়ের ও বয়স হয়েছে। বাহিরের জামা কাপড়ে সংক্রমণ ছড়ার আশঙ্কা একটা থাকে । ওটা একটু ক্ষমা ঘেন্না করেই দিন এই পরিস্থিতিতে ।
অজয় বললো, ওই জন্য তো ওর কথা চিন্তা করে বলেছি, ডিভোর্সের পর ও কিছুতেই আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারবে না ।
বিচারক বললেন ঠিক, আপনার ভীষণ একটা দূরদৃষ্টি রয়েছে ঋত্বিকা দেবীর প্রতি । ঠিক আছে আমরা আমাদের রায়ে উল্লেখ করে দিচ্ছি, যাতে উনি আগে বাড়িতে ফিরে বাথরুম থেকে ফ্রেস হয়ে ফিরে এসেই, পরিবারের কোন কাজ করার আগে আপনার পাশে বসে সমস্ত কথা বলেন । তারপর আপনার চার বছরের মেয়ে, আপনার বাবা মায়ের দিকে খেয়াল করবেন । এটাই সঠিক কি বলেন অজয় বাবু ?
অজয় বললো, না সেটা কি করে হবে ? ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে আমাদের মেয়ে গুড্ডি ওর মায়ের আসার দিকে তাকিয়ে থাকে । বাবা পায়চারি করতে থাকে বাহিরে । রাস্তায় গাড়ি ঘোড়ার যা অবস্থা । ওই কারণে বলেছি ডিভোর্সের পর আমার কাছেই থাকবে ।
বিচারক বললেন ঠিক আছে, আপনার কথাই থাকবে । আপনাদের মতো মানুষ, আজও আছে বলেই, এই সমাজে ভাললাগা ভালবাসা সব বেঁচে আছে । আপাতত এইভাবেই থাকুন, আমরা লকডাউন উঠলে আপনাদের ডিভোর্সের রায় টা জানিয়ে দেব । এই মুহূর্তে অনিয়মিত আদালতের জন্য এই রায় টা ঘোষণা করতে পারলাম না। বলে বিচারক বেরিয়ে যান । আর অজয়ের অলক্ষ্যে যাওয়ার সময় এই অবসাদের জন্য ঋত্বিকা দেবীকে পাশে ডেকে, ওনার স্বামীর দিকে, এই সময় একটু সঙ্গ দেওয়ার জন্য কথা বলে যান ।
( শব্দ সংখ্যা ৮৬২ )
স্বত্ব সংরক্ষিত
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন