ভূতের খোঁজে শ্মশানে


                 ✍️ প্রীতম ভট্টাচার্য

আজকাল হয়তো আমরা সবাই ইংরেজ হয়ে গেছি। তাই বাংলা ক্যালেন্ডার এর কথা আমাদের মনে নেই। আর তিথি মনে থাকার তো প্রশ্নই নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিকে । প্রথমে ভাবলাম অমাবস্যা। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, আমার ধারনা ভুল। অন্ধকার দূর করার জন্য চাঁদটা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে । কিন্তু মেঘের সাথে লুকোচুরিতে জিততে পারছে না।
জানালা দিয়ে চাঁদের কিঞ্চিৎ আলো আমার ঘরেও ঢুকছে । আমাদের এখানে মশার যন্ত্রণা একটু কম। যদিও আগরতলা শহরে এই কথাটা অবাস্তব শোনাবে। কিন্তু এটাই ঠিক। এমন ও হতে পারে মশারা ভূতকে ভয় পায়। কারণ আমাদের বাড়ি শ্মশান , হেঁটে গেলে মাত্র পাঁচ মিনিট। একেবারে কাছাকাছিই বলা যেতে পারে। আজকাল বিদ্যুৎ খুব চঞ্চলতা দেখাচ্ছে। এমনিতেই মেঘলা আকাশের জন্য ভ্যাপসা গরম। মধ্যরাত হয়ে গেছে কিন্তু ঘুম আসছে না। এমনিতেও একেবারে অন্ধকারে আমার ঘুম আসতে চায় না। বিদ্যুৎ থাকলেও একটা  ছোট লাইট জ্বালিয়ে রাখি। 
একটা হ্যারিকেনটা মিট মিট করে জ্বলছে টেবিলে ।ঘুম যখন আসছে না। ভাবলাম উঠে যাই। কিছু লেখালেখি করি। ইদানিং ভূতের গল্প লেখার খুব ঝোঁক এসেছে মাথায় । গল্পটা অর্ধেক লেখা হয়ে গেছে । শেষের দিকটা কি লিখবো সেটা ভাবতে গিয়ে হঠাৎ মাথায় একটা প্রশ্ন আসলো, অশরীরী বলতে আসলেই কি কিছু আছে ? মানুষ কে আনন্দ বা ভয় দেওয়ার জন্য আমরা লেখকরা গল্প লিখে থাকি। সেটা ঠিক। কিন্তু...... প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খেলেও সঠিক উত্তর আমার জানা নেই ।  কিন্তু অনেকেই বলে মধ্যরাতে নাকি শ্মশানে ভূত, প্রেত, অশরীরীরা হেঁটে বেড়ায় । আমার বাড়ির কাছাকাছিই  নদীর পাড়ে একটা শ্মশান আছে। কিন্তু রাতে কখনো সেখানে যাই নি। তাই কথাটা কি আদৌ সত্য ? নিজে পরীক্ষা করে দেখিনি। 
আজ বাড়িতে কেউ নেই। মা থাকলে হয়তো নিষেধ করতেন। এতো রাতে বাড়ি থেকে বের হতে দিতেন না।ধীর পায়ে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলাম । খুব গরম বলে একটা গামছা নিয়ে নিলাম। বার বার ঘাম মোছার জন্য। 
সম্পূর্ণ জনমানবহীন রাস্তা । অবশ্য এই রাত বারোটার সময় রাস্তায় কেউ থাকার কথা ও নয়।
নদীর পাড় ঘেঁষে ছোট একটা শ্মশান । কোনোরকমে বেড়া দিয়ে বুঝানো হয়েছে এতটুকু শ্মশানের জায়গা । দু’একটা কুকুর দেখা যাচ্ছে এদিক ওদিকে । মানুষ পোড়ার আঁশটে গন্ধ পুরো শ্মশান জুড়ে । সন্ধ্যার দিকে হয়তো কাউকে পোড়ানো হয়েছে এখানে। চিতা থেকে এখনো হাল্কা হাল্কা ধোঁয়া উঠছে। ভূতের সন্ধানে দশ মিনিট ধরে এদিক ওদিকে ঘুরলাম। কই না কাউকে দেখতে পেলাম না। ভাবলাম কিছুক্ষণ দাঁড়াই। আবার কিছুক্ষণ হাঁটলাম, না। কেউ নেই। কিছুক্ষণ আগে একটা লাশ পোড়ানো হল। শ্রাদ্ধ টাদ্ধ কিছু হয় নি এখনো। ভূত রূপে তো তার দেখা মেলার কথা।  ভূতেরা তো শুনেছি শ্মশানেই থাকে। আগের ভূত গুলিই বা কোথায়? নাহ্ , কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না । তাহলে কি  ভূত বা অশরীরী বলে কিছুই নাই?"

এ যাত্রায় কোন লাভ হল না। বাড়ি ফিরে এলাম ।
পরদিন দুপুরে খগেন্দ্র দাদুর সাথে দেখা হল পথে । এই এলাকার বয়স্ক লোকদের মধ্যে একজন। বহুদিনের বহু ঘটনা উনার কণ্ঠস্থ। মাঝে মাঝে আমাদের বলে শোনান।
বয়স আশি ছুঁই ছুঁই হলেও আমাদের বয়সী ছেলেদের সাথে উনার ভালই যোগাযোগ। ভালই মেলামেশা। 
দাদুকে দেখেই আমি  জিজ্ঞেস করলাম - আচ্ছা দাদু , অশরীরী বলতে কি কিছু আছে ?
আত্ম বিশ্বাসের সাথে দাদু জবাব দিল- আছেই তো । থাকবে না কেন?
দাদুর কথা শুনে মনে হল, ভূতেরাও বুঝি মানুষ।  আর আমরা যেমন পৃথিবীতে আছি, ভূতদের ও এভাবে থাকতেই হবে।
বললাম- কাল তো মধ্যরাতে আমি শ্মশানে গেলাম । কিছুই তো দেখতে পেলাম না ।
দাদু বললেন - ওদের কি সবসময় দেখা যায় ?তোমার দেখার ইচ্ছে ছিল বলে তুমি শ্মশানে গেছো। তবে ভূতদেরও তো ইচ্ছা থাকতে হবে, তোমাকে দেখা দেবার।
দাদুর কথাটা যুক্তি সঙ্গত মনে হল। কারোর সাথে দেখা করার ইচ্ছা না থাকলে আমরাও তো ব্যস্ততা দেখাই। তবে অমাবস্যার দিন রাতে গিয়ে দেখতে পারো ।
দাদু চলে গেলেন ।
বাড়ি এসে পঞ্জিকা খুলে দেখলাম। আগামী পরশু দিন অমাবস্যা।

মধ্যরাত ।

চারিদিক নিশ্চুপ । গত পরশু দিনের মত  আজও  শার্টের উপর গামছা গায়ে জড়িয়ে  রাত বারোটায় শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলাম । শ্মশানের আশেপাশে আর কোন বাড়ি ঘর নেই । ঝোঁপ জঙ্গলে ভরা চারপাশ । আমি শ্মশানে ঢুকলাম ।একটা চেয়ার পড়ে আছে । চেয়ারটাতে গিয়ে বসলাম । সম্পূর্ণ নীরব জায়গা । একটা পাখির ডাকও শোনা যাচ্ছে না । দিনের বেলাতেই এই শ্মশানের  চারপাশ দিয়ে কেউ হাটেঁ না ভয়ে, আর আমি এত রাতে শ্মশানের ভিতর ঢুকে বসে আছি ।ভূত দেখার আশা নিয়ে। মানুষ শুনলে নির্ঘাৎ আমাকে পাগল বলবে ।
"নাহ্ , বিশ মিনিট তো হয়ে গেল । অদ্ভুত বা ভয়ংকর কিছু তো দেখতে পাচ্ছি না ।"
অগত্যা বাড়ি ফিরে আসলাম ।
অশরীরী দেখার চিন্তা বাদ দিয়ে অসম্পূর্ণ গল্পের দিকে মন দিলাম । কিন্তু অনেক ভেবেও গল্পের শেষ অংশটা মিলাতে পারলাম না ।
লেখার মন মানসিকতা অনেক সময় পরিবেশের উপর নির্ভর করে ।
কথাটা মনে পড়তেই ভাবলাম আবার একবার শ্মশানে ঘুড়ে আসি। এবার নিশ্চয় ভূতের দেখা পাব। সবাই বলে শ্মশানে ভূত থাকে। সবার কথা তো ভুল হতে পারে না।  

শ্মশানের সামনে এসেই মনটা পাল্টে ফেললাম। এখান থেকে আরেকটু সামনে একটা জাম গাছ আছে। বছর কয়েক আগে সেখানে নাকি একটা ছেলে ফাসি দিয়েছিল। দ্বাদশের পরীক্ষা ভালো হয়নি বলে । পরে নাকি ফল বেরোনোর পর জানা গেছিল ছেলেটা ৮৭ শতাংশ নম্বর পেয়েছিল। বেচারা! অনেকেই নাকি সেখানে ভূত দেখেছে। একজন দেখলে মনে করতাম মনের ভ্রম। অনেকের তো আর ভুল হতে পারে না। নিশ্চয়ই সেখানে ভূত আছে। 
দেখা যাক ভূতের দেখা পাই কিনা। হাঁটা শুরু করলাম সেই দিকে । জায়গাটা অনেক নির্জন ।শ্মশানের মতই। সম্পূর্ণ ভৌতিক একটা পরিবেশ । আমার ধারনা ওখানে গেলে হয়তো গল্পের শেষ অংশটা মাথায় আসতে পারে । 

জাম গাছের তলায় গিয়ে দেখি চাদর গায়ে দিয়ে বসে কে যেন কি  লিখছে খাতায় । অবাক হলাম খুব । গাছটা রাস্তা থেকে তিন চার মিটার দূরে। রাস্তার লাইটের যে আলো, তাতে ভালো করে কিছু দেখা যাবার কথা না।  এত রাতে লোকটা  গাছের তলায় বসে কী লিখছে ?দেখে মনে হল , বয়স বেশী হবে না। সে ও কি আমার মত ভূত দেখতে এসেছে নাকি?

জোর গলায় জিজ্ঞাসা করলাম,"এই যে, তুমি কে ভাই ? এত রাতে এখানে কী করছো  ?"

ছেলেটা কিছু না বলে সোজা হাঁটতে লাগলো । আমিও ছেলেটার পিছনে পিছনে হাঁটতে লাগলাম । হাঁটতে হাঁটতে  একেবারে শ্মশানের সামনে চলে আসলাম । কিন্তু  হঠাৎ করে ছেলেটাকে আর দেখতে পেলাম না । এভাবে কেউ  হঠাৎ-ই গায়েব হয়ে পারে? বিশ্বাস হচ্ছিল না । আজ ও শ্মশানে একটা লাশ পোড়ান হয়েছে। চারদিকে শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া । আরে এক্ষণ আবার কে মরলো কিছুক্ষণ আগে আমি এই শ্মশানে এসেছিলাম ভূতের খোঁজে। কই? তখন তো এমন কিছু দেখতে পাইনি। ঘন্টা খানেকের মধ্যে এ কি করে সম্ভব? কিন্তু আমার লেখা অসম্পূর্ণ গল্পটা নতুন এই চিতা নিয়েই ।নিভন্ত চিতাটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। 
হঠাৎ একটা বিড়াল কোথা  থেকে না জানি আমার সামনে এসে ঝপ করে পড়ল। কুচকুচে কালো বেড়ালটার চোখ দুটো খুব উজ্জ্বল। সামনে কোন গাছ টাছ ও নেই। 


হঠাৎ আমার মনে হল আমার পিছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে । তার নিঃশ্বাসের শব্দ আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি । কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য তার অনুভূতিগুলো কেন যেন আমার অনুভূতিগুলোর সাথে মিলে যাচ্ছে । এই প্রথম ভয়ে আমার শরীর কেঁপে উঠলো । ধীরে ধীরে পিছনে ফিরে তাকালাম । তাকিয়ে দেখি আমার সামনে একটা ছেলে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছি ।ছেলেটার চেহেরা একদম আমার অল্প বয়েসের চেহেরার মত।  দৃশ্যটা দেখে কাপঁতে কাপঁতে আমার হাত থেকে মোবাইল টা  পড়ে গেল । ভয় পেলেও সাহস হারাই নি। রাস্তার লাইট গুলো ও একবার জ্বলছে একবার নিভছে। কি হচ্ছে বুঝতে পারছহিনা। মাটি তে পড়ে যাওয়া মোবাইলটা হাতে তুলে নিলাম। ছেলেটি আবার হাটতে শুরু করল ওই জাম গাছটার দিকে। আমিও তার পিছু নিলাম। ভূতকে যে আমি একেবারে ভয় পাইনা , তা নয়। কিন্তু গলায় পৈতা আছে বলে ভূত আমাকে হয়ত ভয় দেখাতে পারবে কিন্তু স্পর্শ করতে পারবে না । এমন একটা বিশ্বাস আছে।

ছেলেটার পিছে পিছে দৌড়াতে দৌড়াতে আমি চিৎকার করে চলছি, কে তুমি? দাঁড়াও, দাঁড়াও। কে শুনে কার কথা। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ছেলেটা একেবারে জামগাছটার তলায় পৌঁছে গেল। আগে থেকেই একটা দড়ি ঝুলছিল জাম গাছটায়। ছেলেটা সোজা এই দড়িটাতে গলা গলিয়ে ঝুলে পড়ল। আর এই অবস্থাতে ও চিৎকার করে করে হাসছে।
শ্মশানের সামনে ছেলেটাকে দেখে একটু ভয় পেয়েছিলাম বটে। কিন্তু এখন ভয় কেটে গেছে। আমি এবার নিশ্চিত যে এই ছেলেটাই ভূত। যাক আমার অনেকদিনের ভূত দেখার ইচ্ছা পূর্ণ হল। 
ছেলে ভূতটা ও বুঝতে পারল, আমাকে ভয় দেখিয়ে কোন কাজ হচ্ছে না। তখন ফাঁসির দড়ি খুলে নেমে এলো।
আমি জিজ্ঞেস করলাম- তুমি কে?
ছেলে ভূতটা আবার হাসতে শুরু করল। কি মারাত্মক হাসি। এই হাসি যেন থামতেই চাচ্ছে না। হাসতে হাসতে জবাব দিল- এখনো কি বুঝতে পারছেন না, আমি হলাম ভূত। এখন এই জাম গাছেই থাকি।
- তোমার কথা আমি শুনেছি।
- কি শুনেছেন আমার ব্যাপারে?
- তেমন কিছু না। তুমি ফাসিতে আত্মহত্যা করেছিলে, পরীক্ষার ফল খারাপ হবে ভেবে।
ছেলেটি আবার অট্ট হাসি হাসতে লাগলো। এতো জোরে হাসতে লাগলো যে আমার কান ফেটে আসছে। হাসতে হাসতে বলল- আমি যা ভেবেছি, তাই ঠিক হল। সবাই মনে করেছে আমি পরীক্ষার খারাপ ফলের জন্য ফাঁসি দিয়েছি। যাক একদিকে ভালোই হল।
ছেলেটার কথাবার্তা আমার মনঃপুত হল না। কি বলছে ঠিক ভাবে বুঝতেও পারছি না।
জিজ্ঞেস করলাম- কি বলেছ? বুঝতে পারছি না। 
- আসলে পরীক্ষা নয় আমি আত্ম হত্যা করেছি অন্য কারণে।
- পরীক্ষার ব্যাপারটাই তো আমরা জানি। তাহলে?
- আমার আত্ম হত্যার কারণ মৌমিতা।
- কোন মৌমিতা?
- মৌমিতা সরকার।
মৌমিতা সরকারকে আমি চিনি। খুব সুন্দরী আর ভদ্র টাইপের মেয়ে।পড়াশুনায় ও ভালো। তার বাবা দুপুরের স্কুলের প্রধান শিক্ষক। 
সন্দেহের কণ্ঠ্যে বললাম- কিন্তু?
আবার জোরে জোরে হাসতে লাগলো ছেলেটি। বলল- কিন্তুর কী আছে? আমার কথা বুঝি আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না। 
- না না, বিশ্বাস হবে না কেন? আসলে আমার মনে হয় তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে। মেয়েটার বাড়ি তো আমাদের বাড়ি থেকে কয়েকটা বাড়ি পরে, ছোট বেলা থেকেই চিনি। তাই বলছিলাম।
- আপনি কিছুই জানেন না। মেয়েটা একটা ফাজিল।তাকে আমি খুব ভালবাসতাম। সে যে আমাকে ধোঁকা দেবে বুঝতে পারিনি। কখনো কখনো মনে হয় ওকে শেষ করে ফেলি। কিন্তু পারি না। মন মানে না। 
- তা, এসব কথা আমাকে বলছ কেন?
- আগেও সত্য কথাটা কয়েকজনকে বলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমাকে দেখেই সবে ভয়ে পালিয়েছে। এমন কি আমার নিজের বাবাও। আজ অনেক দিন পর আপনাকে পেলাম। আপনি ভয় পান নি। তাই আপনাকে বলছি।
- আমাকে কি করতে হবে?
- আপনি আর কি করবেন? আপনাকে কিছু করতে হবে না। সত্য কথাটা জেনে রাখুন। আমাকে নিয়ে একটা গল্প লিখুন। আপনার মত অনেকেই যেমন জানে মৌমিতা খুব ভালো একটা মেয়ে। এই ধারনাটা বদলাক এটা আমি চাই।
- তা তো ঠিক আছে। কিন্তু নাম টাম ঠিক ঠাক লিখলে। কেউ যদি আমার নাম এ মামলা করে?
- এমন কিছুই হবে না। আমি কথা দিচ্ছি।
- ধরো মামলা হল। তখন ভূতের কথা কি আদালত শুনবে?
- তাহলেও আপনাকে সত্য কথাটা বলবো।

আমরা একই ক্লাসে পড়তাম। আমার তৈরি করা নোট লিখেই ও ভালো রেজাল্ট করত। ক্লাস সেভেন থেকেই আমাদের প্রেম। আমরা দুজন ছাড়া কেউই এই ঘটনা টা জানত না। কিন্তু আমার সাথে ও বিশ্বাস ঘাতকতা করল। একাদশ শ্রেণী তে সাব্রুম থেকে বিজয় নামে একটা ছেলে এসে আমাদের স্কুলে ভর্তি হল। মাঝে মাঝে দেখতাম ওরা দাড়িয়ে কথা বলে। আমি সন্দেহ করিনি। একই ক্লাসে পড়ে  কথা তো বলতেই পারে। সন্দেহ করার কি আছে? কিন্তু আমি কি আর জানতাম?
টুয়েলভে উঠার সময় বিজয় আমার কাছাকাছি নম্বর পায়। তখনই আমার সন্দেহ হয়। পরে যখন সৈকত স্যার আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করল- কি কে আকাশ- তুই আর বিজয় কি একই মাস্টারের কাছে পড়িস?  আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম- কেন স্যার? স্যার বললেন- তোদের উত্তর গুলি দেখি একই রকম। আমার আর বুঝতে বাকি থাকে না। আমার নোটস আমি  নিজে  তৈরি করি। মৌমিতা আমার খাতা নিয়ে যায়। তাহলে এই  নোটস বিজয়ের কাছে গেল কি করে। 
আমি বললাম- তুমি মৌমিতাকে এই বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করোনি?
- করেছিলাম, কিন্তু ও অস্বীকার করেছিল। তবু আমার মন থেকে সন্দেহ দূর হয়নি। এভাবেই আরও কয়েক মাস কেটে যায়। টুয়েলভে আমি মৌমিতাকে কোন নোট দিই নি।  নোটস এর কথা জিজ্ঞেস করলে বলি, এ বছর আমি কোন নোটস বানাইনি। এ বছর আমি বই থেকে পড়ব।
- আসলে বই থেকে পড়াই ভালো। 
- একদম। নোটস কিন্তু আমি বানিয়েছিলাম কিন্তু ইচ্ছা করেই ওকে দেইনি। ওকে দেওয়া মানে তো বিজয়কে দেওয়া। একদিন সন্ধ্যায় বিজয় আমাকে কল করে বলে, ওকে নোটস না দিলে ও মৌমিতাকে লেখা আমার প্রেম পত্র গুলি আমার বাবাকে দেখাবে, স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে দেখাবে। একই ফোনে মৌমিতা ও ছিল, সে ও একথা বলল। সে নাকি আমার নামে বানিয়ে বানিয়ে উল্টা পাল্টা কথা আমার বাড়িতে আর স্কুলে জানাবে। আমি কি করব কিছু বুঝে উঠতে পাড়ছিলাম না। আমার তেমন কোন কাছের বন্ধু ও ছিল না , যার সাথে ব্যাপারটা শেয়ার করতে পারি। আর কোন দিন মৌমিতার বিষয়ে কাউকে কিছু বলিনি। এখন বললেই বা কি বলব। সবাই আমাকে খুব ভালো ছেলে বলে জানে। আমি প্রেম টেম করি লোকে জানলে কি বলবে। মৌমিতা দের পাশের গলিতে ওকে একবার চুমু দিয়েছিলাম। ওটার ও নাকি ফটো তোলা আছে বিজয়ের মোবাইলে। আর কি- একদিন রাতে মার শাড়ি নিয়ে চলে আসি এই জাম গাছতলায়।

আকাশের কথা শুনে আমার মনটা ভেঙ্গে গেল। মেয়েরা এভাবে বিশ্বাস ঘাতকতা করলে তো অসুবিধা। মেয়েরাই শুধু নয়। ছেলেরাও অনেক সময় বিশ্বাসঘাতকের কাজ করে। মেয়ে হোক আর ছেলে বিশ্বাসঘাতক দের কঠিন শাস্তি হওয়া দরকার। বিশ্বাস ঘাতকদের আরও অনেক ঘটনা আমি জানি। আমার বন্ধুদের থেকে শুনেছি। কিন্তু তাই বলে কেউ ফাঁসি দেয় নি। আসলে বয়েসের ও একটা ব্যাপার আছে।  মানসিক ভাবে প্রাপ্ত বয়স্ক না হলে এসব থেকে দূরে থাকা উচিত।
সান্ত্বনার স্বরে বললাম- তুমি সবাইকে জানিয়ে দিলেই পারতে। খামখা ফাঁসি দিতে গেলে কেন?
- আমার ও এখন তাই মনে হয়। কিন্তু তখন তা মনে আসে নি। তথন মনে হল, এই জীবন রেখে আর লাভ নেই। যে জীবনে প্রেম নেই। বদনাম আর বদনাম।
- তুমি বদলাও তো নিতে পারতে-
- মাঝে মাঝে মনে হয়। কিন্তু হয়ে উঠে না। পারি না। আমি মনে হয় এখনো ওকে ভালোবাসি। কেন জানি না। ও একটা বাজে মেয়ে। বিজয়কে ও ও ধোঁকা দিয়েছে, তারপর নীলাভ বলে একটা ছেলের সাথে প্রেম করত। এখন আবার অলিন্দ নামের একটা ছেলে।
-
হায়রে ভালবাসা......সকাল হয়ে আসছে।একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা বাতাস বৈছে। সারা রাত ঘুমাই নি। শরীরটা ও দুর্বল লাগছে।কিছু না বলেই আকাশ অদৃশ্য হয়ে গেল।

বাড়ি ফিরতে খগেন্দ্র দাদুর সাথে দেখা। সকাল সকাল সূর্য না উঠতে তিনি হাটতে বের হন। তাই এই বয়েসে ও শরীরটা ধরে রেখেছেন।
আমি বললাম- কি দাদু? এতো সকাল সকাল-
- আমি তো রোজ সকাল সকাল ই বের হই। তুমি এতো সকালে কোথায় যাচ্ছ?
মজা করে বললাম- শ্মশান থেকে আসছি। একটা পেত্নীর  সাথে দেখা করে এলাম। সুন্দরী পেত্নী।
- তা। ঐ পেত্নীর নামটা কি?
- মৌমিতা।

 
মৌমিতার পেত্নী হবার সম্ভাবনা আপাতত নেই। কারণ সে অনেক বছর বাঁচবে। এই মাত্র তার নাম নিলাম। আর হেলমেট আর মাস্কে  মুখ ঢাকা একজনের বাইকের পেছনে করে ও কোথায় যেন যাচ্ছে। বয়েসের হিসাবে এখন কলেজে পড়ার কথা।  আঁটোসাটো  পোষাকে ওর ভরন্ত যৌবন দেখলে যে কোন কারোরই ওর প্রেমে পড়ার কথা। আমি আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকালাম।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন