বেকারদের প্রেম করা অপরাধ !

🖋শ্রী রঞ্জিৎ বিশ্বাস

সেদিন বন্ধু বললো, 'কিরে সারা জীবন কি সিঙ্গেলই থেকে যাবি নাকি? এভাবে তো ওভার এইজ হয়ে যাবি।' কথাগুলো শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ঠিক বলেছিস আমি সারা জীবন সিঙ্গেলই থেকে যাবো আর এভাবেই ধীরে ধীরে ওভার এইজ হয়ে একটা জীবন্ত লাশ মতো ঘরের এক কোণে বসে থাকবো! কারণ কেন জানিস? কারণ, আমি বেকার। শিক্ষিত বেকার। আমার মত যারা বেকার আছে তাদের সিঙ্গেল থাকা ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ নেই যে! কেননা যার প্রায় অন্ধ হয়ে যাওয়া জন্মদাত্রী মায়ের চোখের অপারেশন করার মতো আর্থিক ক্ষমতা নেই, ষাটোর্ধ্ব দিনমজুর বাবার রক্ত ঝড়া পায়ের চিকিৎসা করাতে পারে না, বোনের পড়াশোনার খরচ চালানোর মতো আর্থিক ক্ষমতা নেই অর্থাৎ মা-বাবা-বোনের এই ছোট পরিবারটাকেই সাধারণ ভাবে বাঁচিয়ে রাখার মতো আর্থিক ক্ষমতা যার নেই সেই বেকার মানুষটিকে সিঙ্গেল থাকাটাই যে সবার সুখের একটা অজুহাত । এমন বেকার মানুষদের মনে কাউকে মনের মানুষ বা জীবনসঙ্গী করার বাসনা থাকতে নেই! কেননা যাকে সে হৃদয় থেকে অকৃত্রিম ভাবে ভালোবাসবে তাকে জীবনসঙ্গী করে ঘরে এনে আর্থিক ভাবে কখনোই কষ্ট দিতে পারবে না। যে হৃদয়ের মানুষটির হাতের আঙ্গুল লাল নেইল পলিশে, যার পায়ের রূপার নূপুরে,যার কপালের একটা রঙিন টিপ ও একটা রঙিন শাড়ীতে একখানা মাটির চাঁদের মতো দেখায় তাকে জীবনসঙ্গী করে ঘরে এনে এসব নূন্যতম চাহিদা থেকে বঞ্চিত হওয়াটা মেনে নিতে পারবে না। যে হৃদয়ের মানুষটি নিজের বাবা মায়ের কাছে একটা রাজকন্যার মতো যত্নে থাকে সেই রাজকন্যাকে আর্থিক অনটনে কষ্ট দিতে পারবে না । সেই গানটা মনে আছে ? "প্রেমে পড়া বারণ কারণে অকারণ..." আসলে অকারণে নয় কারণেই বেকারদের প্রেমে পড়া বারণ । কারণটা হলো-- বেকারত্ব । মনে রাখিস, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে বেকারত্ব! এই বেকারত্ব বহু বেকারদের পবিত্র প্রেম-ভালোবাসাকে গলা টিপে হত্যা বা আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে তিলে তিলে। এত চাপা যন্ত্রণার পরেও বেকাররা সবার সামনে কাঁদে না কেন জানিস? কারণ, বেকাররা কাঁদলে চোখ দিয়ে জল নয় রক্ত বের হবে! যদি শোনার মতো ধৈর্য্য শক্তি থাকে তাহলে বেকারদের বুকে কান পাতলেই শোনা যাবে আকাশ ভাঙ্গা ভয়াবহ চিৎকার। আসলে ক্ষুধা জিনিসটা যে কেমন তা একমাত্র একটা ক্ষুধার্ত মানুষই বুঝতে পারে ঠিক তেমনি বেকারত্বের জ্বালা যে কি অসহনীয় তা একমাত্র একটা সত্যিকারের বেকারই বুঝে। পাশাপাশি একটা কথা না বললে অবিচার করা হবে; সেটা হল বেকারের নির্দিষ্ট কোন লিঙ্গ হয় না। বেকারত্বের জ্বালা ছেলে-মেয়ে উভয়কেই ভোগ করতে হচ্ছে। আর এই জ্বালাই বেকারদের মনে এই প্রবণতা জাগিয়েছে যে-- বেকারদের প্রেম করা অপরাধ ! কিন্তু এই অপরাধ প্রবণতা থেকে কি বেকারদের কেউ মুক্তি দিতে পারে না? অবশ্যই পারে । আর যারা পারে তারা হলো একটা রাজ্যের ও দেশের নির্বাচিত সরকার। এর জন্য শুধু চাই সরকারের সৎ স্বচ্ছ পদক্ষেপ। বেকাররা যেদিন একটা যোগ্য স্থায়ী কর্মসংস্থান হাতে পাবে সেদিনই হয়তো বেকাররা তাদের হৃদয়ে চাপা প্রেম-ভালোবাসাকে বুকে জড়িয়ে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে তার মনের মানুষটিকে বলতে পারবে-- হ্যাঁ, আমি তোমাকে ভালোবাসি । আমি আমার পরিবারকে, তোমাকে ও সমাজটাকে ভালোবেসেই ভালো তথা সুস্থ রাখতে চাই। বেকাররা এভাবে ভালোবাসার সাহস পাবে তো? সেই আশায় ভরসায় বুক বেঁধে শত শত বেকার প্রেমিক-প্রেমিকা...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন