✒️জহরলাল দাস
১)" কালো মেয়ের পায়ের তলায়,দেখে যা আলোর নাচন",
২)"আমার শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে,জপি আমি শ্যামের নাম........",
৩)"শ্মশানে জাগিছে শ্যামা............"
৪)"শ্মশান কালীর নাম শুনেরে ভয় কে পায়"...........
৫)" বল রে জবা বল, কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরনতল............"
৬) "আর লুকাবি কোথায় মা কালী "..........
৭) " রাঙা জবার কাজ কি মা তোর........"
৮) "মহাকালের কোলে এসে গৌরী হল মহাকালী.....
৯) "শ্মশান কালীর নাম শুনেরে.....
১০) "আমি শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে/জপি আমি শ্যামের নাম........
১১) "মা হবেন মোর মন্ত্র গুরু/ ঠাকুর হলেন রাধাশ্যাম।"...............
উপরোক্ত গানগুলো শুনে বেশির ভাগ মানুষই প্রথমে একটু বিভ্রান্তিতে পরে যাবেন নিশ্চয়ই। কারন ভক্তিগীতি পর্যায়ের এই শ্যামাসংগীত গুলো নিশ্চয় সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন কিংবা কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের হবে অথবা অষ্টাদশ কিংবা ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্য কোন হিন্দু ভক্ত কবির হবে। কিন্তু না মাতৃ-চরনে নিবেদিত হৃদয় আকুল করা এই গানগুলো উপমহাদেশের অন্যতম অসাম্প্রদায়িক বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের। যিনি জন্মসূত্রে মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করে ও হিন্দু ধর্মের এক দেবীর বন্দনা করেছেন মনে প্রাণে। নজরুল রচিত এই সব শ্যামা সঙ্গীতের ভাব ভাষার অসাধারণ গভীরতা ও স্পন্দন যা প্রতিটি মাতৃ অনুরাগী পাঠককে ভাবালোকে অণুরনিত করে।
নজরুলের এমন শ্যামাসংগীতের সংখ্যা দু'শোর ও অধিক।
উপরে শুধু কয়েকটি গানের প্রথম লাইন উল্লেখ করলাম।
" বলরে জবা বল", আমার কালো মেয়ে রাগ করেছে কে দিয়েছে গালি "........
এমন কয়েকশত শ্যামা সঙ্গীত কবি রচনা করেছেন যেখানে শ্যামা মায়ের প্রতি অনাবিল ভক্তি ও নির্ভরতা সোচ্চার রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। শুধু গান লিখেই তিনি থেমে থাকেন নি। সেই সব গানে তিনি সুরারোপ ও করেছেন।
শ্যামা সঙ্গীতের যে দর্শন তা তিনি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। শ্যামা মায়ের প্রতি অগাধ ভালবাসা ও বিশ্বাস না থাকলে এমন আত্ম নিবেদনের গান লেখা সম্ভব নয়।
কৈশোর বয়সে যখন "লেটো" গানের দলে যোগদান করেন তখন থেকেই হিন্দু সংস্কৃতির সাথে জড়িত বিভিন্ন পালাগান, উপাখ্যান ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর উপর গান রচনা করতেন ও গাইতে থাকেন। ইসলামী সংগীত ও তিনি রচনা করেছেন।
নজরুলের কাছে ধর্মীয় গোঁড়ামির কোন স্থান ছিল না। মন্দির, মসজিদ দুটোকেই সমান চোখে দেখতেন কবি। মন্দিরে তিনি খাঁটি হিন্দু আর মসজিদে তিনি মুসলমান। এজন্য জীবনে কবি উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় মৌলবাদীদের কাছ থেকে অনেক সমালোচনা, অনেক মানসিক নিপীড়ন উনাকে সইতে হয়েছে।
কিন্তু কোন চাপের কাছে তিনি মাথা নত করেননি।
পুত্র বুল বুলের মৃত্যুর পর মানসিক শান্তি খোঁজার জন্য কবি আধ্যাত্মিকতার দিকে আরো ঝুঁকে পরেন। এসময় তিনি লালগোলা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক যোগীবর বরদাচরন মজুমদারের শিষ্যত্ব গ্রহন করেন। বরদাচরন মজুমদার ও ছিলেন একজন তন্রসাধক এবং কালী ভক্ত।
এই বরদাচরন মজুমদারের নিকট হতে আধ্যাত্ম্য শিক্ষা সম্বন্ধে নানা কথা জেনে তিনি কোরান, গীতা, চন্ডী,উপনিষদ,পুরান, তন্ত্র প্রভৃতি গভীর ভাবে অনুশীলন করতে লাগলেন।
কালী ভক্ত ও সাধক হওয়ার জন্য নজরুল ব্যামাক্ষাপার কাছে ও গিয়েছিলেন।
পুত্রের মৃত্যু এবং পরবর্তীতে অসুস্থ স্ত্রী প্রমিলা দেবীর আরোগ্য কামনায় কবি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। মাতৃ সাধক, তন্ত্র সাধক
বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ঔষধ এনেছেন। নিজের অশান্ত মনকে শান্ত করতে মাতৃ সাধনার পাশাপাশি মাতৃ সঙ্গীত অর্থাৎ শ্যামা সঙ্গীত ও রচনা করেছেন। যে গুলো ভাব, ভাষায় ও ভক্তির গভীরতায় অতুলনীয়। একমাত্র নজরুল ইসলামের পক্ষেই এটা সম্ভব। এমন ও কথিত আছে নজরুল সন্ন্যাস গ্রহণ করতে রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠে ও নাকি গিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে রাজেশ্বর মিত্র তাঁর "আগরতলায় শচী দেববর্মণ" স্মৃতিকথায় লিখেছেন --- স্বামী পরজানানন্দের কাছে শুনেছি হিমাংশু দত্ত ও নজরুল ইসলাম উভয়ই রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠে স্বামী অভেদানন্দের কাছে সন্ন্যাসে দীক্ষা নিতে এসেছিলেন। কিন্তু তখন ও সময় হয় নি বলে অভেদানন্দজী তাঁদের অপেক্ষা করতে উপদেশ দিয়েছিলেন।"
তবে নজরুল নিজ ধর্মকে ও কখনো অশ্রদ্ধা করেন নি। নিজ ধর্মের প্রতি ও তিনি সমান সহাভূতিশীল। মন্দির মসজিদে তাঁর কোন ভেদাভেদ ছিল না। তিনি সাম্যের গান গেয়েছেন। তিনি ছিলেন সাম্যের কবি-সম্প্রীতির কবি সর্বোপরি মানবতার কবি।ভক্তিগীতি পর্যায়ের শ্যামা সঙ্গীত, আগমনী সঙ্গীত, বিজয়া , দুর্গা-সরস্বতী বন্দনা, খেয়াল,ঠুমরী, বাউল, কীর্তন তিনি যেমন রচনা করেছেন তেমনি ইসলামী সংগীত,গজল , জারি সারি, মারফতি, মুর্শিদি ইত্যাদি ও তিনি রচনা করেছেন এবং তাতে তিনি সুর ও দিয়েছেন। তাই তো তিনি কবি সব্যসাচী। তিনি হিন্দু - মুসলিম সবার কবি। সবার সঙ্গীত স্রষ্টা, সুরকার ও গায়ক। নজরুলের মতো এমন অসাম্প্রদায়িক, মুক্তমনা, সর্বধর্ম সহিষ্ণু মানুষ তাই আজ ও বিরল। তাই তো তিনি গান--" মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান"।
নজরুলের ভক্তিগীতি পর্যায়ের ঐসব শ্যামা সঙ্গীত, কীর্তন, ভজন, ইসলামী গান তাই সর্বজনীন। হিন্দু, মুসলিম সবার কন্ঠেই এইসব গানগুলো তাই আজ ও গীত হয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন