✒️দিব্যেন্দু নাথ
ভোরের আলতো আলোয় কুয়াশায় ভেঙ্গে দেওনদীর চর দেখা যাচ্ছে। নন্দীনি সাত সকালে এসে দেখে যেত, নদীর হাসি-কান্না গড়ানোর পথ। যেন কোনো বিস্মৃত কবিতার পঙ্ক্তি নিয়ে চলে এই নদী। চারদিকে শিউলি আর ধানের সুবাস, বাঁশঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে রোদের ফোঁটা পড়ে ধুলোর মত, আর দূরে কোথাও এক নামহীন পাখির সুর ভেসে আসে—যেন কোনো প্রাচীন কষ্ট ফিসফিস করে ডাকছে।
এই স্বপ্নজাল ঘেরা নন্দনগ্রামে জন্মেছিল নন্দীনি একদিন। চোখে ছিল কোনো এক অচেনা পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি - যেখানে ভালোবাসা মানে শুধুই স্পর্শ নয়, আশ্রয়, সম্মান আর নিজেকে চিনে নেওয়ার স্রোত।
একদিন হাটফেরা পথে দেখা হয়েছিল নিখিলের সঙ্গে। সে ছিল আগুনে চোখের বিদ্রোহী এক যুবক। বলেছিল - তোর চোখে নদীর শান্তি আছে নন্দীনি... তুই আমার স্বপ্নের মত।
নন্দীনি ভেবেছিল, হয়তো এটাই প্রেম।
সে স্বপ্ন দেখেছিল একটি ছোট্ট ঘরের, যার ছাদ ফুটো, মেঝেতে জল, কিন্তু অন্তরে ভালোবাসার দীপ্তি। নিখিলকে বলেছিল - চেষ্টা করব, তুই আগে রোজগার কর।
কিন্তু প্রেম কি কেবল প্রতিশ্রুতি আর ত্যাগের নাম?
কিছুদিন পর দুজনের বিয়ে হয়। মানুষের ভাষায় ভালোবাসার বিয়ে। পাঁচ বছরের মধ্যে দুই কন্যা সন্তান জন্ম।
হঠাৎ একদিন নিখিল হারিয়ে গেল। ঠিক যেমন শুকিয়ে যাওয়া নদী একদিন নিঃশব্দে হারিয়ে যায় দিগন্তে। সমাজ বলল, - স্বামী ফেলে গেছে? দুই মেয়ে নিয়ে কোথায় যাবে? আইন বলল, - তোমরা আর স্বামী-স্ত্রী নও।
নন্দীনি কাঁদল না। চোখের জলে না ভিজিয়ে, শুধু বেদনা সেলাই করল বুকে।
এরপর এলো নির্মল সরকারি চাকুরে, শান্ত মনের মানুষ। নন্দীনির ক্লান্ত দৃষ্টিতে সে দেখেছিল নতুন আশার আলো। বলেছিল, - তোমার মেয়েরা আমারও হবে... যদি তুমি রাজি থাকো।
নন্দীনি ভেবেছিল, এবার বুঝি আশ্রয় মিলেছে।
কিন্তু নির্মলের সংসারে ছিল প্রথমা - প্রথম স্ত্রী।
সে মেনে নিতে পারেনি নন্দীনির অস্তিত্ব। দুই সংসারে চলত দ্বন্দ্ব, নির্মল ছুটত দুই ঘর। যখন প্রথমা জানতে পারে, নন্দীনি পোয়াতি হচ্ছে। চরম আকার ধারণ করে ঝগড়া। তার বাপেরবাড়ির লোক এসে শাসিয়ে যায় নির্মলকে। আত্মগ্লানিতে ভুগতে থাকে। পৃথিবীর সব ঝঞ্ঝাট থেকে মুক্তি পেতে এক ঝড়ের রাতে, ফ্যানের দড়িতে দুলতে থাকে নির্মলের স্তব্ধ দেহ। পেটের সন্তান ও সমাজের কাঁটা নিয়ে একা দাঁড়িয়ে রইল নন্দীনি নদীর ঘাটে।
মা এসে বলেছিলেন- তুই মরলে তিনটে প্রাণ মরবে। আর না মরলে, সমাজ তোকে ছিঁড়ে ফেলতে পারে, কিন্তু বিচার করার অধিকার একমাত্র তোর।
নন্দীনি আবার মাথা তুলে দাঁড়াল। একদিন এক পত্রিকায় ছোট্ট একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল। “স্ত্রী-সন্তানহীন পেনশনার, পরিচারিকা চান। সন্তান থাকলেও চলবে, যদি বিবাহে রাজি থাকেন।”
নন্দীনি দেখা করতে গেল। লোকটি ছিল আশি বছরের বৃদ্ধ। তাঁর ক্লান্ত চোখ, শান্ত মুখ। বললেন, - জীবনের শেষ প্রান্তে আমি কাউকে কিছু দিয়ে যেতে চাই।
নন্দীনি দাঁড়িয়ে আছে, পুরনো মাটির ঘরের বারান্দায়। দূরে সূর্য হেলতে হেলতে হারিয়ে যায় সোনালি ধানের ক্ষেতে। গোরু ফিরে যাচ্ছে গোয়ালে, পাখিরা বাসায়, আর একলা নারীটি আপন আলো-ছায়ায় ভাবছে - নিখিল চেয়েছিল শরীর, নির্মল দিয়েছিল ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি, কিন্তু একমাত্র এই বৃদ্ধ....। ছায়ার মতো নিরাপত্তা বিনিময়হীন এক ভরসা, সন্তানদের পদবি। তাদের হাসিই তো একমাত্র উৎসব হতভাগীর। হৃদয়ের সেই আগুন আর লুকাবে না, কাঁন্নাও আসছে না আর মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে। সমাজ প্রশ্ন করবে! - তিনবার বিয়ে? উত্তর দেয় -না, তিনবার বাঁচা। নারীরা শুধুই ভাঙে না, গড়েও। শুধু সহ্য করে না, নিজেই ইতিহাস লেখে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন