মেয়েবেলার দুর্গাপূজো

     ✍️ ইন্দ্রানী ভট্টাচার্য

সকাল গুলো বেশ অন্য রকম ছিল তখন। শরৎ আসার সাথে সাথেই হাওয়ায় একটা মিষ্টি আমেজ ভেসে বেড়াতো। শিউলি ফোঁটা ভোরে গায়ে লাগতো পাতলা কুয়াশার চাদর। পরিযায়ী পাখীরা ধীরে ধীরে ভিড় জমাতো বড় পুকুরটার পাশের কদম গাছটাতে। পুতুল খেলার বাক্স তখন গুছিয়ে তুলে রাখা হতো উঁচু তাকের এক কোণে। চতুর্দিকে কেবলই সাজো সাজো রব। 
মা, দিদিদের দেখতাম ঘটা করে ঘরদোর পরিষ্কার করতে। দেবী পক্ষের আগে পিতৃপক্ষের প্রত্যেকটা সকালে বাবা তর্পণ করতেন। বাবা বলতেন, পূর্বপুরষরা স্বর্গ থেকে নেমে আসেন একফোঁটা জলের আশায়। তাই পিতৃপক্ষের প্রত্যেকটা দিনই তাঁদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করা খুব জরুরী। মহালয়ার দিন দেখতাম বাড়ীতে পার্বণ শ্রাদ্ধ করতেন বাবা। দুপুরবেলা পঞ্চব্যাজ্ঞনে রান্না করে মা পুরুত মামাকে খাওয়াতেন।
মহালয়ার আগের দিন সকাল থেকে আমরা তিনবোন মিলে ফর্দ তৈরী করতাম। কারণ ঐদিন বাবা আমাকে নিয়ে পূজোর জন্য প্রসাধন কিনতে যেতেন। তুহিনা, বসন্ত মালতী, পন্ডস পাউডার,রঙীন ক্লিপ, লাল ফিতে..... আরো অনেক কিছু। সেইসঙ্গে বাবা নিয়ম করে প্রতি বছর চারটে নিপ্পো বেটারী কিনতেন। ফেরার পথে সুরমা বেকারী থেকে বিভিন্ন ধরণের বিস্কিট কিনে ফুরফুরে মনে বাবা মেয়ে বাড়ী ফিরতাম। ভোর বেলা লণ্ঠনের আলোয় বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের গমগমে আওয়াজে “আশ্বিনের এই শারদ প্রাতে....” র সঙ্গে রান্নাঘরে মায়ের চা বানানোর কাপপ্লেটের আওয়াজ ভোর’টাকে বড় মায়াময় করে তুলত....
আমরা ছেটবেলায় কখনো পূজোর কাপড় কিনতে যেতাম না। বাবা থান কাপড় কিনে আনতেন আর মা সারাদিনের কাজ শেষে রাতে মেসিন নিয়ে বসে তাঁর শিল্প নৈপুন্যের ছোঁয়ায়একটু একটু করে জামা সেলাই শেষ করতেন। মা’য়ের তৈরী সেই জামাগুলো আমাদের কাছে যে কী মহার্ঘ্য ছিলো তা এখনকার ব্রেন্ডেড জামা গুলোকেও তৃপ্তিতে হার মানাতো....
মেয়েবেলায় মহালয়ার ভোরে পাড়ার পূজো মন্ডপে মহিষাসুর মর্দিনীর অনুষ্ঠান থাকতো। সবাই মিলে মিশে সক্কাল সক্কাল মা’য়ের আবাহনের মজা’ই  আলাদা ছিল....।
তখনো মনে হতো, আর এখনো মনে হয়— পূজোর দিনগুলো এতো ছোট হয় কি ভাবে ? তিনটে দিন যেন বাতাসের আগে মিলিয়ে যায়। তখন স্নান সেরে নতুন জামা পড়েই পাশের বাড়ীর পূজোতে দে দৌড় ! সারাদিন ওখানেই অজ্ঞলি, ভোগ খাওয়া আর একদিন দুপুরে মা’য়ের সাথে অটো করে ঘুরতে যাওয়া.. তখন আসলে এখনকার মতো রাত্রিবেলা প্যান্ডেল হপিং এর রেওয়াজ ছিল না। বেলুন,টিকলি বন্দুক ছিল নিজের কেতা জাহির করার মোক্ষম উপায়। এখন ভাবি,পূজোটা কীভাবে বদলে গেলো ! বিবর্তনের হাত ধরে খুব সন্তর্পনে আমাদের চারপাশে যে কতো পরিবর্তন এসে গেলো ... তা আমাদের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মন্থন করলেই বোঝা যায়। তবুও শরৎকাল দেখলেই মন নেচে ওঠে... মহালয়ার চন্ডীপাঠ শুনলেই মা’য়ের পূজোর official announcement হয়ে যায়, বিজয়ায় মিষ্টিমুখের চিরায়ত প্রচলন এখনো মনে করিয়ে দেয় বাঙালির একমাত্র উৎসব দুর্গাপূজোর কথা ! যা বহমান কাল ধরে বাঙালির পরিচয়কে বিশ্বের কাছে তুলে ধরবে...
                5-10-2021

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন